পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। প্রবাসে কেটেছে জীবনের ১০ বছরেরও বেশি সময়। কঠোর পরিশ্রম করে ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার পশ্চিম সিড্যা গ্রামের মারুফ বেপারী। কিন্তু সেই প্রবাসজীবনের করুণ সমাপ্তি হলো গুলিতে। বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। দেশে পড়ে আছে তার শোকাহত পরিবার, আর দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থানীয় একটি হাসপাতালে রয়েছে তার লাশ।
মারুফের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর থেকেই শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার সিড্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম সিড্যা গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোকের পাশাপাশি এখন পরিবারের সদস্যদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা—কবে দেশে ফিরবে তার লাশ, কবে শেষবারের মতো দেখতে পাবেন তাকে।
বিজ্ঞাপন
চাঁদার বিরোধ, তারপর গুলি
পরিবার ও প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ১০টার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের বুষ্টার এলাকার কাছাকাছি জুলুটেম্বা নামের একটি লোকেশনে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলিবিদ্ধ হন মারুফ বেপারী। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থানীয় কিছু ব্যক্তি নিরাপত্তার নামে মারুফের কাছে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ দক্ষিণ আফ্রিকান র্যান্ড দাবি করতেন। সম্প্রতি অতিরিক্ত টাকা দাবি করা নিয়ে তাদের সঙ্গে মারুফের কথা-কাটাকাটি হয়। এর জেরেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
স্বজনদের প্রশ্ন, দূতাবাস কি দেখছে না?
মারুফের মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছে তার পরিবার। স্বজনদের কাছে এই মৃত্যু কেবল একজন প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা নয়; বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশির নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন।
নিহতের স্বজন কামরুজ্জামান বেপারী বলেন, চাঁদার জন্য বিদেশের মাটিতে আমার কাকা মারুফ বেপারীকে জীবন দিতে হয়েছে। ওখানকার দূতাবাস কি এগুলো দেখে না?
তিনি বলেন, এখন তাদের প্রধান চাওয়া, সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে মারুফের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুক। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।
বিদেশের মাটিতে পড়ে আছে লাশ
মারুফের লাশ দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তবে লাশ দেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য সময়সূচি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বজনেরা। তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
পরিবারের সদস্যদের কাছে এখন প্রতিটি মুহূর্ত দীর্ঘ অপেক্ষার। বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারানো মারুফকে শেষবারের মতো দেখা এবং নিজ গ্রামের মাটিতে তাকে দাফন করার আকাঙ্ক্ষাই এখন স্বজনদের প্রধান চাওয়া।
প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন
জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বহু বাংলাদেশি পাড়ি জমান দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তাদের অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করে পরিবারের ভরণ-পোষণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখেন। কিন্তু বিদেশে কর্মরত ও ব্যবসায় নিয়োজিত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়।
মারুফ বেপারীর মৃত্যুর ঘটনায় প্রবাসী ব্যবসায়ীদের তোলা চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য হলে এটি প্রবাসে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তাহীনতার গুরুতর চিত্র তুলে ধরে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ, প্রবাসীদের অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার এবং দূতাবাসের প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সহযোগিতা জরুরি।
মারুফের স্বজনেরা চান, তার মৃত্যুর ঘটনা যেন তদন্ত ও বিচারের বাইরে থেকে না যায়। একই সঙ্গে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের সদস্যদের শেষবারের মতো তাকে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ডামুড্যার পশ্চিম সিড্যা গ্রামের মানুষের কাছে এখন মারুফের স্মৃতি আর স্বজনদের কান্না। যে মানুষটি একদিন পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় দেশ ছেড়েছিলেন, তারই নিথর দেহ ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে পরিবার। সেই অপেক্ষার অবসান কবে হবে, কবে প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানাতে পারবেন তারা—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে শোকাহত স্বজনদের মনে।
এমএইচ
