বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার, চোরাচালান ও মাদক পাচার প্রতিরোধ এবং অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। প্রচলিত টহলব্যবস্থার পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা, থার্মাল ইমেজিং, নাইট ভিশন ডিভাইস, ড্রোন, রাডার ও আধুনিক যোগাযোগপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সীমান্ত নজরদারির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাহিনীটি।
সীমান্তের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত টহলের সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সমন্বয় করা হচ্ছে।
বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান বলেন, সীমান্তের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, নিরাপত্তাঝুঁকি ও অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন বিবেচনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রচলিত টহলব্যবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সমন্বয় ঘটিয়ে সীমান্তের সার্বিক নিরাপত্তা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব মুর্শেদ রহমান জানান, সিসিটিভি ও দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ ক্যামেরার সাহায্যে নির্দিষ্ট এলাকার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়। থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তি তাপের পার্থক্য শনাক্ত করে অন্ধকার ও কম দৃশ্যমানতার পরিবেশে নজরদারিতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, নাইট ভিশন ডিভাইস রাতের বেলায় পর্যবেক্ষণ ও টহল কার্যক্রম সহজ করে।
এসব প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার সন্দেহজনক তৎপরতা শনাক্ত করা এবং সীমান্ত পরিস্থিতি মূল্যায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিস্তীর্ণ ও দুর্গম সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে ড্রোন প্রযুক্তির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন এই কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, আকাশপথে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দুর্গম এলাকা, নদী ও চরাঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। পাশাপাশি, রাডার ও অন্যান্য সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের গতিবিধি শনাক্ত করতে সহায়তা করে।
আধুনিক বেতার ও ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থাও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং অভিযান পরিচালনায় সমন্বয় বাড়ানো সম্ভব।
তবে প্রযুক্তি কখনোই সীমান্তরক্ষীদের বিকল্প নয় বলে মন্তব্য করেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব মুর্শেদ রহমান। তিনি বলেন, প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকর মাধ্যম। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত সদস্যদের উপস্থিতি, স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা, গোয়েন্দা তথ্যের যথাযথ ব্যবহার এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে উপযুক্ত স্থাপন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো এবং দক্ষ অপারেটর প্রয়োজন। একই সঙ্গে তথ্যের নিরাপত্তা, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং প্রযোজ্য আইন ও মানবাধিকারের নীতিমালা অনুসরণ করাও জরুরি।
ভারতের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। অন্যদিকে, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭১ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই সীমান্তের বিভিন্ন অংশে নদী, পাহাড়, বনাঞ্চল, চর ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি থাকায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা বিজিবির জন্য একটি বড় অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ।
এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) স্থাপন, বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আধুনিক নজরদারি সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়ানোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের টহলের সমন্বিত ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নজরদারি জোরদার এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে টহল পরিকল্পনা করা গেলে সীমিত জনবল ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।
সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বিজিবির নিয়মিত অভিযানে মাদকদ্রব্য ও চোরাচালানি পণ্য জব্দের ঘটনাও গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর ব্যবহার এবং পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনার গুরুত্ব তুলে ধরে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্তবর্তী জনগণের সুরক্ষা দেওয়া এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে বিজিবি।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের টহল কার্যক্রমের সমন্বয়ের মাধ্যমে সীমান্তে অপরাধ প্রতিরোধ ও উদ্ভূত পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শরীফুল ইসলাম আরও বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবির আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: বাসস
