বুয়েনস আইরেস,১৬ অক্টোবর-প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের কঠোর অর্থনৈতিক নীতি ও বাজেটের তীব্র সংকটের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাঙ্গন। দেশটির নামী সরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব বুয়েনস আইরেসের বিজ্ঞান ভবনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে এক দিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন দখলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। মূলত উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং সরকারের অবহেলার প্রতিবাদ জানাতেই ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতিতে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা।
আর্জেন্টিনার এই বিখ্যাত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতে, সরকারের অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণে সেরা শিক্ষকেরা দলে দলে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো তো দূরের কথা, মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পদার্থবিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও শিক্ষাদানের কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের বিনামূল্যের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ইতিহাসের অন্যতম কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছেন প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিনি হাজার হাজার সরকারি কর্মীকে ছাঁটাই করেছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বন্ধ করেছেন, ভর্তুকি কমিয়েছেন এবং বিভিন্ন অনুদান কর্মসূচি বাতিল করেছেন।
সরকারের দাবি, এসব কঠোর পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কমে মাসে প্রায় ২ শতাংশে নেমে এসেছে। পাশাপাশি দেশটি টানা ২৭ মাস ধরে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে নিজের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন প্রেসিডেন্ট মিলেই।
তবে সরকারের এসব দাবির সঙ্গে তীব্র দ্বিমত পোষণ করছেন দেশটির সাধারণ মানুষ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। মিলেইয়ের নীতির কারণে একদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী কল্যাণ তহবিল, পেনশনভোগী এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী চরম সংকটে পড়েছে। গত বছর কংগ্রেস বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন বাড়ানো এবং প্রতিবন্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণা-সংক্রান্ত দুটি আইন পাস করলেও তহবিলের উৎস না থাকার অজুহাতে মিলেই সরকার সেগুলো কার্যকর করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট পুনরুদ্ধার, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি এবং গবেষণা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় একটি ফেডারেল আদালত সরকারকে প্রতিদিন ১ লাখ পেসো বা প্রায় ৭০ মার্কিন ডলার জরিমানা করতে শুরু করেছে।
আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং সরকারের অবহেলার প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় নেমে আসেন। সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়ে বিক্ষোভকারীরা শহরের কেন্দ্রস্থল অবরুদ্ধ করে রাখেন। শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ সময় কংগ্রেস ভবনের সামনের চত্বর প্রায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন এবং অন্তত ২৫ জনকে আটক করা হয়।
রসায়ন বিভাগের এক অধ্যাপক জানান, মাসে মাত্র ৭০০ ডলার বেতনে জীবন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ কারণে বাধ্য হয়েই শেষ উপায় হিসেবে তাঁকে রাজপথে নামতে হয়েছে। তাঁর মতে, সবার জন্য বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। একদিকে একটি বড় অংশ মিলেইয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল পাওয়ার আশায় এখনো তাঁকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা সরকারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এস এম/ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
