অরুন্ধতী রায় ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’-এ শৈশবের স্মৃতিকে উপজীব্য করে কল্পনার জাল বুনেছিলেন; কিন্তু এবার তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন বাস্তবের ক্যানভাস। তাঁর প্রয়াত মা মেরি রায়ের সঙ্গে এক জটিল অথচ গভীর সম্পর্কের স্মৃতিকথা ‘মাদার মেরি কামস টু মি’। এই গ্রন্থে অরুন্ধতী তাঁর অস্থির, তেজস্বী মায়ের জীবন, তাঁর সংগ্রাম এবং সমাজের প্রতি তাঁর কাজের প্রতিফলনকে কেন্দ্র করে এক আন্তরিক হিসাব-নিকাশ করেছেন।
মেরি রায়, যিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ ও কর্পাস ক্রিস্টি হাই স্কুলের (বর্তমানে পল্লীকুডাম) প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর সন্তানদের কাছে ছিলেন এক দুর্দমনীয় শক্তি। স্মৃতিকথায় অরুন্ধতী অকপটে তুলে ধরেছেন মায়ের সেই দ্বৈত রূপ—যিনি একদিকে ভালোবাসতেন ও শেখাতেন; অন্যদিকে আবার নিষ্ঠুর আচরণে সন্তানদের আহত করতেন। এই গ্রন্থ কেবল মা-মেয়ের ব্যক্তিগত আখ্যান নয়; এটি এক সিঙ্গেল মাদারের প্রতিকূল সমাজে লড়াই, পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক মামলায় জয় এবং অরুন্ধতীর গণবুদ্ধিজীবী হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনের শিকড়ের গল্প। মায়ের প্রতি ‘ভয়ে ভয়ে, নিঃশর্ত’ ভালোবাসা থেকে ‘শীতলভাবে, যুক্তিসঙ্গত’ ভালোবাসার পথে অরুন্ধতীর যে আত্ম-অনুসন্ধান, সেই জটিল বন্ধন ও বৈপরীত্যকে আলিঙ্গন করার আহ্বানই হলো এই স্মৃতিকথা—যা পাঠকের মনেও নিজেদের জটিল মানববাস্তবতাকে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ এনে দেয়।
এ গ্রন্থের কেন্দ্রে রয়েছে লেখকের অস্থির, তেজস্বী মা মেরি রায়ের সঙ্গে সম্পর্ক– যিনি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ৮৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন। প্রতিটি স্মৃতিকথাই এক ধরনের হিসাব-নিকাশ। লেখক তাঁর জীবনের সব রূপ ও পরিচয়ের হিসাব মেলান। তিনি জীবনের যেসব রূপ একসঙ্গে কাটিয়েছেন, তার মীমাংসা করেন। এ গ্রন্থে অরুন্ধতী রায় তুলে ধরেছেন মা-মেয়ে সম্পর্ক, একজন সিঙ্গেল মাদার নারীর সংগ্রাম এবং সমাজে তাঁর কর্মের প্রতিফলন– যা গ্রন্থটিকে সাধারণ মানুষের কথ্য করে তুলেছে।
মায়ের মৃত্যুর অভিঘাতে বিদীর্ণহৃদয় অরুন্ধতী রায় সেসব পথেই ফিরে তাকান, যেগুলো তিনি সুদূর অতীতে পেরিয়ে এসেছেন। স্মৃতিকথা শুরু হয় মায়ের জীবনাবসান দিয়ে, তারপর ঘুরপাক খেয়ে ফিরে যায় শুরুর দিকে। মায়ের সঙ্গে সন্তানের ভালোবাসা সহজাত, তবে সেই সন্তান যখন মাকে পর্যালোচনা করেন, মায়ের সংগ্রাম ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে ভালোবাসেন– তখন তা বিশেষ হয়ে ওঠে।
‘মিসেস রায়’– যেভাবে তাঁর ছাত্রছাত্রীরা, মেয়ে অরুন্ধতী এবং ছেলে ললিত কুমার ক্রিস্টোফার রায় তাঁকে সম্বোধন করতেন– ছিলেন প্রকৃতির এক দুর্দমনীয় শক্তি। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ এবং কোট্টায়াম-এ প্রতিষ্ঠিত ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্পাস ক্রিস্টি হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। মাদার মেরি কখনোই ‘সবকিছু যেমন চলছে, তেমনই চলতে দাও’ বলার মানুষ ছিলেন না।
কয়েক বছর আগে ওয়েইনাড় সাহিত্য উৎসবে অরুন্ধতী রায় এক লোকারণ্য সভায় বলেছিলেন, মেরি রায় ছিলেন তাঁর চেনা সবচেয়ে অসাধারণ নারীদের একজন। তিনি সহাস্যে যোগ করেন, ‘আর এর অন্যতম কারণ ছিল– তিনি একদমই ভালো মা ছিলেন না।’ অরুন্ধতী তখন বলেছিলেন, ‘তাঁকে ভালোবাসতে গিয়ে, তাঁর জেদি স্বভাবের প্রশংসা করার জন্য আমার নিজেকে কন্যা-পরিচয় থেকে মুক্ত করতে হয়েছিল।’
স্মৃতিকথায় দেখা যায়, মেরি রায় প্রায়ই সন্তানদের উপর রাগ ঝাড়তেন। তিন বছরের অরুন্ধতী মায়ের নিষ্ঠুর আচরণ সইতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, হাঁপানির শ্বাসকষ্ট মাকে আরও নির্মম করে তোলে। অরুন্ধতী ও দেড় বছরের বড় ভাই মায়ের হাতে নিগৃহীত, তিরস্কৃত, অপমানিত হতে হতে নীরব, পলায়নপর হয়ে যায়। ভাইয়ের মনে কিছু স্মৃতি আছে, তবে তিন বছরের অরুন্ধতীর নেই। মা মেরিই তার পৃথিবী। মাকে সে নিজের সর্বস্ব দিয়ে অসহায়ভাবে ভালোবাসে।
মেরি যেমন মেয়েকে গড়ে তুলতেন, তেমনি আবার গুঁড়িয়ে দিতেন। তিনি যেমন মেয়েকে চিন্তা করতে শিখিয়েছিলেন, তেমনি আবার তাঁর চিন্তার জন্যই ক্ষুব্ধ হতেন। স্মৃতিকথার শুরুতেই অরুন্ধতী বলেছেন, মায়ের এই বৈপরীত্য বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি নিজেই এক গোলকধাঁধায় পড়ে যান। আর এই অনুসন্ধানই তাঁকে আজকের অরুন্ধতীতে পরিণত করেছে।
বড় হওয়ার পর অরুন্ধতী বুঝতে পারলেন, মেরির বাস্তবতাও ছিল ভীষণ বৈরী। মেরির বাবা মদ্যপান ও অত্যাচারে পূর্ণ ছিলেন, মেরি ঠিক করেন, প্রথম যে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, তাকেই বিয়ে করবেন। বিয়ে করে দেখলেন, স্বামী মদ্যপানে আসক্ত ‘এক অস্তিত্বহীন মানুষ’। এছাড়া উদ্ধত ভাই জর্জ ইসাকও ছিলেন প্রতিকূল। ছোটবেলায় অরুন্ধতী মাকে ভালোবাসতেন ‘অযৌক্তিকভাবে, ভয়ে-ভয়ে, নিঃশর্তভাবে’; প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে তিনি চেয়েছিলেন মাকে ভালোবাসতে ‘শীতলভাবে, যুক্তিসঙ্গতভাবে, আর নিরাপদ দূরত্বে থেকে’– যদিও প্রায়ই ব্যর্থ হয়েছেন।
বইটির প্রথমাংশে অরুন্ধতী বর্ণনা করেছেন, কীভাবে মা সন্তানদের নিয়ে আসাম থেকে কেরালায় গিয়ে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান গড়েন। মদ্যপ বাবা রাজীব মাইকেল রায় (‘মিকি রায়’) সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন আসামের চা-বাগানে। সংসার জীবনে অতীষ্ঠ হয়ে মেরি সন্তানদের নিয়ে কলকাতা হয়ে তামিলনাড়ুর উটিতে চলে যান। পরে কেরালার আয়েমেনেম গ্রামে যান, যা কোট্টায়ামের কাছে, মীনাচিল নদীর তীরে অবস্থিত। এটিই মেরি রায়ের জন্মস্থান। উপার্জনহীন, দরিদ্র পরিবারটি পৈতৃক এক কামরার বাসায় আশ্রয় নেয়। উটিতে পাড়ি দেওয়ার সময় অরুন্ধতীর বয়স ছিল তিন, ললিতের সাড়ে চার। তাদের বাবার সঙ্গে পরবর্তীতে যোগাযোগ হয় কেবল বিশের কোঠায় পৌঁছানোর পর। উটিতে মা-সন্তান ত্রয়ীর এই ‘পলাতক জীবন’-এর দিনলিপি লিখেছেন অরুন্ধতী।
একদিন তাদের মামা জর্জ ইসাক ও নানি হঠাৎ হাজির হন উচ্ছেদ করতে। যুক্তি– এক মেয়ে, যে এক বাঙালি হিন্দুকে বিয়ে করে এবং পরে তালাক দিয়ে সিরীয় খ্রিস্টান সমাজে কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে, তাঁর বাবার বাড়িতে থাকার অধিকার নেই। আয়েমেনেমে থাকাকালীন একক মা ও সন্তানদের আত্মীয়স্বজন ও সমাজ দুই পক্ষ থেকেই অবাঞ্ছিত করে তোলা হয়। এই অংশ ভীষণ হৃদয়বিদারক। অরুন্ধতী সেই তীব্রতা ও অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন, যা পরে ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ গ্রন্থে ফুটে ওঠে।
সেই সময় সিরীয় খ্রিস্টান সমাজে মেয়েরা সম্পত্তির অধিকার পেত না। মেরি নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান অধিকারের দাবিতে। আদালত তাদের উত্তরাধিকারে সমান অধিকার নিশ্চিত করে। কোট্টায়ামে রোটারি ক্লাবের ঘর নিয়ে মেরি শুরু করেন স্কুল, যা তাঁকে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত করে।
সমাজ ও মানুষ সম্পর্কে অরুন্ধতীর প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গীটা খুব ছোটবেলা থেকেই গড়ে উঠেছিল। তিনি বলেন, ‘‘একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত ভারতীয় মেয়েকে যে ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, আমার ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। আমাদের দেখাশোনা করার কথা বলে বিনিময়ে মাঝে মাঝে আমাদের পেটানোর জন্য কোনো বাবা ছিল না। আমার ছিল না কোনো জাত, শ্রেণী বা ধর্ম, চোখে ছিল না ঐতিহ্যের ঠুলি, চশমায় ছিল না ঐতিহ্যের কাঁচ, যেগুলো গা থেকে ঝেড়ে ফেলা সত্যিই কঠিন। সম্ভবত আমিই ভারতের একমাত্র মেয়ে, মা যাকে বলতেন, ‘আর যা-ই করো না কেন, কখনো বিয়ে করো না’। বিয়ের আনুষ্ঠানে কনে দেখলে আমার গায়ে যেন ফুসকুড়ি উঠতো। এটাকে আমার পৈশাচিকই মনে হতো। অলংকারসজ্জিত এই প্রাণীটিকে আমার জ্বলন্ত কাঠের মতো ভয়াবহ লাগতো, যেমনটা আমি আমার উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এ লিখেছিলাম।’’
মায়ের সঙ্গে অরুন্ধতী রায়
অরুন্ধতী বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ও লেখায় নিজের ছোটবেলা ও মায়ের স্মৃতিচারণ করেছেন। বলেছেন যে, ছোটবেলাতেই তিনি মায়ের কাছ থেকে স্বাবলম্বী হতে শিখেছিলেন। মা কখনো তাঁকে নিজের ‘দুর্ভাগ্যের’ জন্য দায়ী করতেন, আবার তিনিই মেয়েকে এই সমাজের বিরুদ্ধে, মানুষের পক্ষে লড়াইয়ের দীক্ষা দিতেন। মায়ের এই দ্বৈত আচরণ প্রথমদিকে তিনি বুঝতে পারতেন না। ধীরে ধীরে অরুন্ধতী মায়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বগুলো বুঝতে পারেন। এক সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী বলেন, ‘সমাজটাকে বোঝার ক্ষেত্রে আমার প্রথম শিক্ষক হলেন মা।’
সামাজিক সমস্যা আর অসুস্থতার কারণে তাঁর মা সবসময়ই রাগান্বিত থাকতেন। যার প্রভাব পড়ে অরুন্ধতীর বেড়ে ওঠার সময়ে। তিনি বলেন, ‘‘মা সবসময়ই অসুস্থ থাকতেন, তাঁর শ্বাসকষ্ট ছিল। যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় তিনি থাকতেন আমার নানার বাড়িতে আর সবাই আমাদের সবসময় বলতো, তোমাদের এখানে থাকার কোনো অধিকার নেই। মা ছিলেন রুক্ষ আর তিক্ত; আবার তিনিই ছিলেন সুন্দর আর কোমল। আমার মনে হয় যখন কেউ তাকে রাগিয়ে দিতেন, তখন সেই রাগটা তিনি একমাত্র আমার আর আমার ভাইয়ের ওপরই ঝাড়তে পারতেন, সেজন্যই আমাদের অনেক বকা খেতে হয়েছে।’’
লেখালেখির ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা অনেক কাজে লেগেছে অরুন্ধতীর। প্রথম উপন্যাসের মূল চরিত্রও ছিলেন তাঁর মা। মা বেঁচে থাকতে এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনে এই মানুষটির প্রভাব সম্পর্কে অরুন্ধতী বলেন, ‘‘মা আমাকে ভেঙেছেন এবং গড়েছেন; আবার ভেঙেছেন এবং গড়েছেন আবার ভেঙেছেন, গড়েছেন আর এখনো তা চলছে।’’
২০০৭ সালে ‘দ্য প্রগ্রেসিভ’ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী রায় মায়ের সম্পর্কে বলেন, ‘‘তিনি ছিলেন ‘ফেলিনি’র সিনেমার বিপথগামী কোনো চরিত্রের মতো। পুরোপুরিই একরোখা ছিলেন। কখনো পুরুষ মানুষের প্রয়োজন হয়নি এমন একজন নারীকে দেখাও যে সম্ভব, তা এক অসাধারণ ব্যাপার। এভাবে যন্ত্রণা না পেয়ে বেঁচে থাকাটা সত্যিই আশ্চর্যের। আমরা অনেক উড়ো চিঠি পেতাম। আমার মা একটি স্কুল চালাতো, যা ছিলো দৃশ্যত সফল। লোকজন তাদের সন্তান জন্মাবার আগেই এই স্কুলে তাদের সন্তানদের নাম লিখিয়ে নিতো। তারা বুঝতে পারতো না আমার মাকে বা আমাকে নিয়ে কি করা যায়। আমরা দুজনই নারী এবং তাদের ভাষায় প্রথাবিরোধী, যা ছিলো প্রধান সমস্যা।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘কেরালায় কিন্তু আমার মায়ের বেশ একটা পরিচিতি আছে। কারণ ১৯৮৬ সালে তিনি ভারতে প্রচলিত সিরীয় খ্রিষ্টান উত্তরাধিকার আইন সংশ্লিষ্ট জনগুরুত্বপূর্ণ একটি মামলা জিতেছিলেন। আগের আইন আনুযায়ী, নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ অথবা পাঁচ হাজার রুপি (এ দুটির মধ্যে যেটির পরিমাণ কম সেটি) পেতেন। বস্তুত ১৯৫৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ের মাধ্যমে এই আইন বাতিল করে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারীর জন্য সমধিকার নিশ্চিত করে। কিন্তু খুব অল্প নারীই এই রায়ের সুবিধা নিতে পারে। চার্চগুলো এ বিষয়ে এতটাই তৎপর ছিল যে, তারা পিতাদের সম্পত্তি উইল করতে প্ররোচনা দিতো, যাতে কন্যাদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায়।’’
স্মৃতিকথার দ্বিতীয়ার্ধে অরুন্ধতী যান দিল্লিতে, স্কুল অব প্ল্যানিং অ্যান্ড আর্কিটেকচারে পড়তে। তখন তাঁর বয়স ১৬; মায়ের বিরুদ্ধে গিয়েই পরিবার থেকে পালিয়ে যান। সাত বছর মায়ের সঙ্গে দেখা করেননি, মা-ও খবর নেননি। পরে ‘ইন্ডিয়া টুডে’ ম্যাগাজিনে তাঁর প্রবন্ধ দেখে ফোন নম্বর জোগাড় করতে পেরেছিলেন। অরুন্ধতী নিজের খরচায় পড়াশোনা করেন। তিনি বিয়েও করেন প্রথম প্রেমিক গেরার্ড দা কুনহা ওরফে জেসিকে। তখন তারা উপকূলীয় শহর গোয়ায় বসবাস করতেন। সেখানে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতে থাকেন। ফিরে আসেন দিল্লিতে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আরবান অ্যাফেয়ার্সে চাকরি পান। স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রকার প্রদীপ কৃষাণের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনিই অরুন্ধতীকে ‘মেসি সাহিব’ (১৯৮৫) নামের ঔপনিবেশিক ভারত সম্পর্কিত একটি চলচ্চিত্রে অন্যতম নারী চরিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাব দেন। পরবর্তীকালে তাঁরা বিয়েও করেন। জীবনে আর্থিক স্থায়িত্ব আসার পরও চলে যানন প্রদীপ ও তাঁর সন্তানদের সঙ্গে গড়ে তোলা আপাত সুখের ঘর ছেড়ে।
স্মৃতিকথায় নিজের ব্যক্তিগত জীবনের– চলচ্চিত্র নির্মাণ, লেখালেখি, গণবুদ্ধিজীবিতা, গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ– সব ইতিহাস লিখেছেন অরুন্ধতী। প্রতিবার জীবনসন্ধিক্ষণে এসে তিনি বুঝেছেন, তাঁর শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার পটভূমি তাঁকে বিকল্প দিয়েছে, যা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগালের বাইরে। এজন্য এবং তাঁর ইস্পাতদৃঢ় মেরুদণ্ডের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ তাঁর মায়ের প্রতি। তিনি লিখেছেন, ‘‘যত অস্থির ও দুর্বলই হোক না কেন আমার পরিস্থিতি, আমি কোনোদিন তা ভুলিনি।’’ আর প্রতিটি বাঁকবদলে মায়ের ছায়া অরুন্ধতীকে পথ নির্ধারণে সাহায্য করেছে।
দীর্ঘ নীরবতার পর মা-মেয়ের পুনর্মিলন হয়। তখন শুরু হয় জীবনের সেই ধাপ– মাকে ভালোবাসার চেষ্টা করা ‘শীতলভাবে, যুক্তিসঙ্গতভাবে, আর নিরাপদ দূরত্বে থেকে’। বছরের পর বছর অরুন্ধতী নিজেকে অভিনেত্রী, অ্যাকটিভিস্ট, চিত্রনাট্যকার, প্রাবন্ধিক এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে গড়ে তুলছিলেন; মায়ের উপস্থিতি ছিল ‘আশ্রয় ও ঝড়’– দুটি মিলিত রূপেই।
অরুন্ধতীর প্রথম উপন্যাস ‘গড অফ স্মল থিংস’ তাঁকে ৩৬ বছর বয়সে এনে দিয়েছিল বিপুল খ্যাতি ও বুকার পুরস্কার। তবে তার আগে ১২ বছরের জীবন ছিল কষ্ট ও সংগ্রামের। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, বস্তারে মাওবাদীদের সঙ্গে অভিযাত্রা, হিন্দুত্ববাদ ও মুসলিম-বিদ্বেষের প্রতিবাদ, কাশ্মীরের ঘটনাবলি, ‘মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’– সব মিলিয়ে একজন স্পষ্টবাদী, তেজস্বিনী, প্রতিবাদী গণবুদ্ধিজীবীর ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গণবুদ্ধিজীবী বলতে বোঝায় এমন এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীকে, যারা কেবল জ্ঞানচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন; বরং সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুক্তি, অধিকার ও ন্যায়ের সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তারা নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের জীবনের সঙ্গে নিজেদের ভাবনাকে যুক্ত করেন এবং জ্ঞানচর্চাকে কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়; বরং রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় হিসেবে বিবেচনা করেন।
গণবুদ্ধিজীবীরা সাধারণত—সমাজের ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগণের কণ্ঠস্বর হন; বিদ্যমান রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির দমনমূলক কাঠামোর সমালোচনা করেন; জনগণের বাস্তব জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থেকে জ্ঞানচর্চা করেন; তাত্ত্বিক চিন্তার পাশাপাশি বাস্তব সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেন বা তাতে প্রেরণা যোগান। আজকের দিনে যেখানে ভারতের মূলধারার প্রতিটা মিডিয়া হিন্দুত্ববাদী শিল্পগোষ্ঠীর দখলে, যেখানে একে একে বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, শিল্পীদের একটা বড় অংশ হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শিবিরে নাম লিখিয়েছেন; সেখানে স্রোতের বিপরীতে হাঁটছেন একজন অরুন্ধতী রায়। আর এর পেছনে রয়েছে তাঁর বেড়ে ওঠা ও জীবনের বিভিন্ন স্তরে সংগ্রামী অভিজ্ঞতা অর্জন।
এই স্মৃতিকথা হলো অরুন্ধতী রায়ের শিকড়ের গল্প– একজন লেখক, নিভৃতচারী ব্যক্তি, গণবুদ্ধিজীবী এবং ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য বলার সাহসের উৎস। তিনি পাঠকদের জন্য নিজের ব্যক্তিগত খসড়া শেয়ার করেছেন। লক্ষ্য হলো ভালোবাসার দ্বৈততা গুছিয়ে তোলা নয়; জীবনকে সুন্দর সাজানো অংশে পরিণত করাও নয়। স্মৃতিকথা হলো ভালোবাসার স্মৃতি ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মধ্যকার ফারাক ঘুচিয়ে দেওয়ার এক সেতুবন্ধন।
গ্রন্থে তিনি স্বীকার করেছেন, মায়ের মৃত্যুতে যে অতল দুঃখ অনুভব করেছেন, তাঁর ভাই তেমন কিছুই অনুভব করেননি। এই বিপুল শোক তাঁর কাছে রহস্যময়। এখানেই তিনি বৃহৎ পরিসরে ভাবেন– নিজেকে বোঝা গেলে হয়তো বিশ্ব ও দেশকেও বোঝা যেত কীভাবে অনেক মানুষ তাদের নিপীড়কদেরই পূজা করে; আর তাদের কী করতে হবে, কী পরতে হবে, কী খেতে হবে এবং এমনকি কীভাবে ভাবতে হবে, সেই নির্দেশদাতাদের প্রতিও কৃতজ্ঞবোধ করে।
‘মাদার মেরি কামস টু মি’ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি আমাদের আহ্বান জানান, মা ও মেয়ে, আত্মীয়তা ও বন্ধুত্ব, জাতিসত্তা ও ব্যক্তিসত্তা, দেশপ্রেম ও প্রগতি সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা করতে। তাঁর নীতি হলো জটিলতা ও বৈপরীত্যকে আলিঙ্গন করা, কোনো পরিপাটি মোড়কে সাজানো নয়। অরুন্ধতী স্বচ্ছতা খোঁজেন, তবে শিক্ষণীয় উপদেশ পাঠকের কণ্ঠে চাপিয়ে দেন না। বইটি সুচারু বিন্যাসে গড়া এক অনুসন্ধান– মানববাস্তবতার গভীরে লুকিয়ে থাকা জটিল বন্ধনের প্রতিফলন; এর উদ্দেশ্য সমাধান নয়। তিনি বলেন, ‘‘হয়তো কিছু কিছু বিষয় না-বোঝাই ভালো… আমি তো সেই অধরা পর্বতের পক্ষে, সেই অজেয় চন্দ্রালোকের পক্ষে।’’
এ কারণেই তাঁর স্মৃতিকথায় বাস্তব জীবন ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হতে পেরেছে, যা পাঠকের মনে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা দেয়।
মাদার মেরি কামস টু মি | ২০২৫ | অরুন্ধতী রায় | স্ক্রিবনার | ৩৫২ পৃষ্ঠা
