শক্তির আরাধনায় নবরাত্রির প্রতিটি দিনই যেন এক একটি নতুন উপলব্ধির অধ্যায়। প্রথম দিনে আরাধিত হন মা শৈলপুত্রী—পর্বতরাজ হিমালয়ের কন্যা পার্বতী। আর দ্বিতীয় দিনে সেই পার্বতীই পূজিত হন মা ব্রহ্মচারিণী রূপে। দেবীর এই রূপে ধরা পড়ে আত্মোপলব্ধি, সংযম আর লক্ষ্যে অবিচল থাকার এক অনন্য আখ্যান। এ কেবল এক দেবীর রূপান্তরের কাহিনি নয়, বরং নিজের অভীষ্টে পৌঁছতে আত্মশক্তিকে চিনে নেওয়ারও গল্প।
খণ্ডকাসুর বধের পর দেবীর অন্তর্নিহিত চেতনার সুপ্তি ভাঙল। তিনি উপলব্ধি করলেন, মহাদেবই তাঁর আরাধ্য, তিনিই তাঁর গন্তব্য। কিন্তু সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেব তখন গভীর যোগসমাধিতে নিমগ্ন। তাঁকে লাভ করার পথ সহজ নয়। প্রয়োজন কঠোর তপস্যা, ধৈর্য আর অবিচল সংকল্পের।
রাজকন্যার ঐশ্বর্য, প্রাচুর্য—সব কিছু ত্যাগ করলেন দেবী। পরিধানে শ্বেতবস্ত্র, হাতে কমণ্ডলু, গলায় রুদ্রাক্ষমালা। কৈলাসের পথে যাত্রা করলেন তিনি। যিনি তাঁর আরাধ্য, সেই মহেশ্বরের সান্নিধ্যই হবে সাধনার ক্ষেত্র। শুরু হল ব্রহ্মচর্য পালন ও কঠোর তপস্যা। সংযমের আগুনে নিজেকে শুদ্ধ করে তোলার সেই সাধনার মধ্য দিয়েই দেবী পরিচিত হলেন মা ব্রহ্মচারিণী নামে।
সংকল্পের সাধনা
কথিত আছে, মহাদেবকে লাভ করার জন্য দেবী দীর্ঘ পাঁচ হাজার বছর অতিবাহিত করেন কঠোর তপস্যায় । সময় বয়ে গিয়েছে, বদলেছে ঋতু। প্রকৃতি দেখিয়েছে তার নানা প্রতিকূল রূপ। দেহে এসেছে ক্লান্তি, তবু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি দেবী। তাঁর সাধনার কঠোরতা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন দেবতারাও। যিনি সকলের মা, তাঁর এমন কঠিন তপস্যা তাঁরা কীভাবে সহ্য করবেন!
এ দিকে তারকাসুরের অত্যাচার ক্রমশ বাড়তে থাকে। পুরাণকথা অনুযায়ী, তারকাসুর প্রায় অবধ্য; মহাদেবের পুত্রের হাতেই তার মৃত্যুর বিধান। অথচ মহাদেব তখন যোগসমাধিতে নিমগ্ন। তাঁর ধ্যান ভাঙবে কী ভাবে? দেবতাদের কাছে তখন পার্বতীর সাধনাই হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
অবশেষে দেবতাদের অনুরোধে কামদেব, ধ্যান ভাঙানোর চেষ্টা করেন মহাদেবের । কিন্তু সেই প্রচেষ্টার পরিণাম হয়েছিল ভয়াবহ। ক্রোধাগ্নিতে কামদেবকে ভস্ম করেন মহেশ্বর। যার ফলে দেবতাদের উদ্বেগ আরও বাড়ে। কিন্তু এতকিছুর পরেও পার্বতীর সংকল্পে চিড় ধরেনি। কোনও প্রতিকূলতাই তাঁকে সাধনার পথ থেকে সরাতে পারেনি। বরং তাঁর একাগ্রতা আরও গভীর হয়ে উঠেছিল।
এই তপস্যার কাহিনিতে রয়েছে আরও এক অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। বাহ্যিক সাধনার পাশাপাশি দেবীর অন্তরেও চলছিল এক গভীর রূপান্তর। সতী ও পার্বতী—দুই জীবনের চেতনা যেন এগিয়েছিল এক মহাসত্যের দিকে। পুরাণের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায়, এই আত্মোপলব্ধিই মহামায়ার পূর্ণ স্বরূপ উপলব্ধির পথ।
সাধনার পথে বাধা
তবে সাধনার পথ কি কখনও বাধাহীন হয়? লোককথার একটি আখ্যানে দেখা যায়, তপস্যারত দেবীকে আক্রমণ করেছিল প্রচণ্ডাসুর। বিপুল সেনাবাহিনী নিয়ে সে হাজির হয় দেবীর সামনে। সাধনার অন্তিম লগ্নে আসন ছেড়ে উঠতে নারাজ দেবী। তাঁর সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। কিন্তু অসুরসেনাকে প্রতিহত করা সহজ ছিল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে উল্টে যায় দেবীর কমণ্ডলু (ঘটি)। সামান্য জল মুহূর্তে ধারণ করে সমুদ্রের প্রবল রূপ। সেই উত্তাল জলরাশিতে ভেসে যায় অসুরসেনা। এর পর দেবী চোখ মেলতেই তাঁর তেজে ভস্মীভূত হয় প্রচণ্ডাসুর।
আখ্যানের এই অংশ যেন মনে করিয়ে দেয়, শক্তির প্রকাশ সব সময় বাহ্যিক আড়ম্বরের উপর নির্ভরশীল নয়। কখনও সামান্য একটি উপকরণও অসীম শক্তির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন শুধু অটল সংকল্প আর আত্মসংযম। দেবীর কমণ্ডলুর জল তাই শুধু অলৌকিক শক্তির প্রকাশ নয়, সাধনার অন্তর্নিহিত সামর্থ্যেরও প্রতীক হয়ে ওঠে।
অন্তরের সাধনা, জীবনের শিক্ষা
মা ব্রহ্মচারিণীর আরাধনা কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর তপস্যার কাহিনি জীবনের নানা স্তরে আত্মসংযম, ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। কোনও লক্ষ্যে পৌঁছতে চাইলে শুধু ইচ্ছা থাকলেই চলে না, নিজেকেও সেই লক্ষ্যের উপযুক্ত করে তুলতে হয়। পথে বাধা আসবে, কখনও ক্লান্তি গ্রাস করবে, কখনও সংশয় তৈরি হবে। তবু লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই সাধনা।
যোগদর্শনের প্রতীকী ব্যাখ্যায় স্বাধিষ্ঠান চক্রের সঙ্গে দেবীর সাধনার যোগসূত্র টানা হয়। এই স্তরকে আত্মসচেতনতা, অন্তর্গত প্রবৃত্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সাধনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। নিজের অন্তর্জগৎকে চিনে নেওয়া, আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে সংযত করা এবং মনকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করাই এই উপলব্ধির মূল কথা।
শ্বেতবসনা, রুদ্রাক্ষমালা ও কমণ্ডলুধারিণী মা ব্রহ্মচারিণী তাই শান্ত, ধীর অথচ অটল সাধনার প্রতিমূর্তি। তাঁর রূপে যেমন রয়েছে ত্যাগের বার্তা, তেমনই রয়েছে আত্মশক্তিকে চিনে নেওয়ার আহ্বান।
নবরাত্রির দ্বিতীয়া তাই শুধু দেবীর আরাধনার দিন নয়, নিজের সংকল্পকে নতুন করে চিনে নেওয়ারও উপলক্ষ। যে সাধনা বাহ্যিক জগতের প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করতে শেখায়, সেই সাধনাই এক সময় মানুষকে নিজের গভীরে পৌঁছে দেয়। কারণ, মুক্তির পথ শুধু বাইরের জগৎ জয় করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নিজের অন্তর্জগৎকে চিনে নেওয়াও সেই যাত্রার অপরিহার্য অংশ।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।
