দিনাজপুরের বীরগঞ্জের দলুয়া গ্রামের মাঠে বিস্তীর্ণ জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি চাষে ব্যস্ত কৃষকরা। ছবি:খবরের কাগজ
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। উঁচু জমিতে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপির আবাদ। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ চারা রোপণে ব্যস্ত, আবার কেউ সেচ, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই দমনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
আগাম বাজার ধরতে পারলে বাড়তি দামে সবজি বিক্রি করে ভালো লাভের আশায় বুক বাঁধছেন কৃষকরা। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারজাতের সময় প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে তাদের মধ্যে।
সরেজমিনে বীরগঞ্জ উপজেলার সাতোর ইউনিয়নের প্রাণনগর, দলুয়া ও ২৫ মাইল, ভোগনগর ইউনিয়নের ভাবকি ও বটতলীসহ নিজপাড়া ও পল্টাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, সীম, বেগুনের আবাদ। কোথাও সারি সারি সবুজ চারা, আবার কোথাও ফুলকপি, বাঁধাকপি ধরতে শুরু করেছে। মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। কৃষকরা পরিচর্যায় ব্যস্ত।
কৃষকরা জানান, শীতের মৌসুমের শুরুতে বাজারে ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিমসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে ওই সময়ে বাজারজাত করতে পারলে সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি দাম পাওয়া যায়। মূলত বাড়তি লাভের আশাতেই প্রতিবছর আগাম জাতের সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে।
বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৫৯৩ হেক্টর জমিতে ফুলকপি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ১৭০ হেক্টর জমিতে আগাম ফুলকপির আবাদ হয়েছে। গত বছর একই সময়ে আগাম ফুলকপি আবাদ হয়েছিল মাত্র ৯২ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আগাম ফুলকপির আবাদ বেড়েছে প্রায় ৭৮ হেক্টর। এ ছাড়াও গতবছরের তুলনায় এ বছর বাঁধাকপি ও শিমের আবাদ বেশি হয়েছে।
২৫ মাইল এলাকার কৃষক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়ছে। বর্তমানে আমাদের আগাম ফুলকপির চারা বড় হচ্ছে। আশা করছি, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সবজি বাজারে তুলতে পারব। কিন্তু তখন বাজারে কী দাম পাব, সেটি নিয়ে এখন থেকেই চিন্তায় আছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের উৎপাদিত সবজি স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কিনে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান। অনেক সময় কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কিনে দূরের বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতে কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি ভোক্তাকেও বেশি দামে সবজি কিনতে হয়। তাই উৎপাদনের সময় ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারজাতের সময় ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।’
নিজপাড়া গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম বলেন, ‘এ বছর প্রায় ৫০ শতক জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করেছি। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম ও টমেটোর চারা এখন মাঠে বেড়ে উঠছে। সারসংকটের কারণে কিছুটা বেশি দামে সার সংগ্রহ করতে হয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচও বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আগাম সবজি চাষে পরিশ্রম অনেক বেশি। রোগবালাই হলে বাড়তি খরচ করতে হয়। তাই বাজারে বিক্রির সময় যদি ভালো দাম না পাই, তাহলে আমাদের লোকসানে পড়তে হবে। কৃষকের উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি পর্যায়ে নজরদারি ও বাজার ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
উপজেলার দলুয়া গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, তার ফুলকপির খেত বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ২০ থেকে ২২ দিনের মধ্যে ক্ষেতের ফুলকপি বাজারজাত করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘আগাম ফুলকপি চাষ করেছি ভালো দামের আশায়। শীতের শুরুতে বাজারে সরবরাহ কম থাকায় দাম ভালো পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একসঙ্গে অনেক কৃষক সবজি বাজারে তুললে দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
২৫ মাইল এলাকার কৃষক শামীম হায়দার এবার চার বিঘা জমিতে আগাম ফুলকপি চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগাম সবজি চাষে শ্রম, সার, কীটনাশক ও সেচ বাবদ খরচ বেশি হয়। জমি থেকে ভালো ফলন পেলেও বাজারে যদি দাম কমে যায়, তাহলে কৃষকের লাভের বদলে লোকসান হতে পারে। তাই আমরা ফলনের পাশাপাশি বাজারদরের দিকে তাকিয়ে আছি।’
কৃষকদের ভাষ্য, আগাম সবজি চাষে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বাজারদর। একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনেক কৃষক একসঙ্গে সবজি বাজারে তুললে সরবরাহ বেড়ে যায়। তখন হঠাৎ দাম কমে গেলে উৎপাদন খরচও উঠে আসে না। আবার কৃষকের খেত থেকে ভোক্তার বাজার পর্যন্ত কয়েক ধাপে সবজি হাতবদল হওয়ায় দামের বড় পার্থক্য তৈরি হয়। এতে কৃষক কম দাম পেলেও শেষ পর্যায়ে ভোক্তাকে বেশি দামে সবজি কিনতে হয়।
২৫ মাইল এলাকার সবজি ব্যবসায়ী হায়দার মুন্সি বলেন, ‘২৫ মাইলসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় আগাম জাতের বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, শিম ও শসার চাষ হয়। কৃষকরা এসব সবজি স্থানীয় বাজারে নিয়ে আসেন। এখান থেকে ট্রাকযোগে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, ‘কৃষকরা যাতে ন্যায্য দাম পান, সেটি আমরা বিবেচনায় রেখেই সবজি কিনি। তবে সবজি পরিবহনে খরচ বেড়েছে। কাঁচা সবজি সময়মতো বাজারে না পৌঁছালে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরিবহন, শ্রমিক, বাজার খরচসহ নানা ব্যয় হিসাব করেই আমাদের সবজি কিনতে ও বিক্রি করতে হয়।’
কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরাসরি বাজারজাতের সুযোগ তৈরি করা গেলে আগাম সবজি চাষ আরও লাভজনক হবে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি বড় বাজারে সবজি পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে মনে করছেন তারা।
বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ১৭০ হেক্টর জমিতে আগাম ফুলকপি চাষ হয়েছে। কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে আগাম ফুলকপির খেতগুলোর অবস্থা ভালো রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলন ও বাজারদর–দুটিই অনুকূলে থাকলে আগাম ফুলকপি চাষ করে কৃষকরা লাভবান হতে পারবেন। এ কারণে আগামীতে বীরগঞ্জে আগাম ফুলকপির আবাদ আরও বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের প্রত্যাশা, শুধু উৎপাদন বাড়লেই হবে না; উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। আগাম সবজি বাজারজাতের সময় যেন হঠাৎ দরপতন না ঘটে এবং কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম পাওয়া যায়–এ জন্য বাজার মনিটরিং ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
