বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ শুধু বাংলার লোকসংগীতের এক বিস্ময়কর সাধক নন, তাঁর সৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক দর্শন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। তাঁকে নিয়ে বিদেশেও চর্চা ও গবেষণা হচ্ছে, যা বাংলার মানুষের জন্য বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন ক্লোজআপ তারকা সংগীতশিল্পী বিউটি।
বিউটির মতে, লালন শাহ তাঁর গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে মানবধর্মের যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় পরিচয়ের আগে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা রয়েছে তাঁর গানে। এই মানবিক বোধই লালনের সৃষ্টিকে সময়ের সীমানা পেরিয়ে চিরন্তন করে তুলেছে।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত স্মরণোৎসবের আবহে বার্তা২৪.কমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বিউটি।
লালন শাহের গান ও দর্শন নিয়ে নিজের উপলব্ধি তুলে ধরে বিউটি বলেন, লালন আমাদের অনেক বড় সম্পদ। তাঁর সৃষ্টি, আধ্যাত্মিকতা ও জীবনদর্শন বিস্ময়কর। একজন মানুষ তাঁর গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে কত গভীর কথা বলে যেতে পারেন, লালনকে বুঝতে গেলে তা উপলব্ধি করা যায়। তাঁর গান শুধু সংগীত নয়, এর মধ্যে জীবনের কথা, মানুষকে চেনার কথা এবং নিজের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার কথা রয়েছে।
দেশের বাইরেও লালনকে নিয়ে চর্চা ও গবেষণার বিষয়ে বিউটি বলেন, এটি আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। বাংলাদেশের একজন সাধকের গান, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে বিদেশের মানুষও আগ্রহী হচ্ছেন, চর্চা করছেন ও গবেষণা করছেন। এটি আমাদের সংস্কৃতির জন্য গর্বের বিষয়। লালনের সৃষ্টি কোনো নির্দিষ্ট সময় কিংবা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গানে এমন কিছু কথা রয়েছে, যা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মিলে যায়।
লালনের দর্শনে মানবধর্মের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানুষকে ভালোবাসা। মানুষ আগে, তারপর অন্য সব পরিচয়। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু সবার আগে পরিচয় মানুষ। লালন তাঁর গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে সেই কথাই বুঝিয়ে গেছেন। বিভেদ তৈরি না করে মানুষকে ভালোবাসতে হবে এবং মানুষের মর্যাদা দিতে হবে।
লালনের বাণী মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি প্রসঙ্গে বিউটি বলেন, এর মধ্যে গভীর অর্থ রয়েছে। মানুষকে ভালোবাসা, মানুষের পাশে থাকা এবং নিজের ভেতরের মানবিক সত্তাকে জাগিয়ে তোলার শিক্ষা রয়েছে এ বাণীতে। সময় ও পৃথিবী বদলালেও মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং মানবিকতার প্রয়োজন কখনো শেষ হয়ে যায়নি। এ কারণেই লালনের বাণী আজও মানুষকে ভাবায়।
বর্তমান সময়ে লালনের দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে বিউটি বলেন, ধর্ম, পরিচয় কিংবা বিশ্বাসের পার্থক্য থেকে মানুষের মধ্যে অনেক সময় দূরত্ব তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে লালনের গান মানুষ হিসেবে এক হওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর দর্শন শেখায়, শুধু বাহ্যিক পরিচয় দিয়ে কাউকে বিচার করা যায় না। মানুষের ভেতরের মানবিক সত্তাকে চিনতে হবে।
নতুন প্রজন্মের কাছে লালনকে পৌঁছে দিতে তাঁর গান শোনানোর পাশাপাশি সৃষ্টির মর্মার্থ বোঝানোর ওপর গুরুত্ব দেন বিউটি। তাঁর মতে, শুধু গান গাইলেই হবে না, গানের কথার অর্থও বুঝতে হবে। লালন কেন মানুষকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তাঁর গানে কেন বারবার মানবতার কথা এসেছে, সেসব বিষয়ও নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে। তাঁর গান ও দর্শন যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তত বেশি মানুষ তাঁর সৃষ্টির গভীরতা উপলব্ধি করতে পারবেন।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন স্মরণোৎসবের তাৎপর্য তুলে ধরে বিউটি বলেন, লালন শাহের নামের সঙ্গে ছেঁউড়িয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এখানে এলে তাঁর স্মৃতি, গান ও দর্শন নতুন করে অনুভব করা যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন, লালনের গান শোনেন এবং তাঁর সম্পর্কে জানেন। এ আয়োজন লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে লালনকে নিয়ে চর্চা ও গবেষণার বিস্তার বাংলার সংস্কৃতির জন্য বড় প্রাপ্তি। গানের মধ্য দিয়ে মানুষকে ভালোবাসা, আত্মঅনুসন্ধান ও মানবতার শিক্ষা দিয়ে যাওয়া এই সাধকের দর্শন আজও মানুষকে নতুন করে ভাবতে অনুপ্রাণিত করছে।
