শিক্ষা একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতা, সনদ অর্জনের প্রতিযোগিতা, কর্মমুখী দক্ষতার ঘাটতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এসব সংকট শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হাসান।
ক্ষয়িষ্ণু শিক্ষাব্যবস্থা ও সংকটাপন্ন প্রজন্ম
মো. আব্দুল্লাহ আল নোমান
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
বর্তমান যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জন ও গবেষণার চেয়ে সনদ পাওয়ার প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, স্বাধীন চিন্তা ও গবেষণার আগ্রহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্যও একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীরা আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও তথ্যপ্রযুক্তির পর্যাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। অংশগ্রহণমূলক পাঠদান, সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষা এবং কার্যকর পরামর্শদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব।
শিক্ষার চেয়ে সনদের গুরুত্ব বেশি
কানিজ ফাতেমা
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম সংকট হলো জ্ঞানের চেয়ে সনদ অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। পরীক্ষার ফল ও জিপিএর প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও চিন্তাশক্তির বিকাশ অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষাগত দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের মতো ব্যবহারিক যোগ্যতার ঘাটতি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে। কারিগরি শিক্ষার প্রতি অনীহা, অতিরিক্ত কোচিংনির্ভরতা, ব্যবহারিক ক্লাসের অভাব এবং গবেষণায় অপর্যাপ্ত বরাদ্দও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পার্থক্য রয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও প্রয়োগমুখী করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা জরুরি।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন
সঞ্চিতা অধিকারী সোমা
বাংলা বিভাগ
জাতীয় সমৃদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে মানসম্মত শিক্ষার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষার মান, অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, সেশনজট, গবেষণার সীমিত সুযোগ, নকলের প্রবণতা এবং শিক্ষাকে বাণিজ্যিকভাবে দেখার মানসিকতা শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব সমস্যা সমাধানে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারণে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তক ও অবকাঠামোর মান উন্নত করা প্রয়োজন। অ্যাসাইনমেন্ট, দলগত কাজ ও ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি। শিক্ষায় পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ এবং সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামতের ভিত্তিতে বৈষম্যহীন ও সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞানার্জন
ওবাইদুল্লাহ আল মাহবুব
আইন বিভাগ
বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও শিক্ষার্থীরা যদি বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তা হলে শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। ফলে মুখস্থবিদ্যার চর্চা বাড়লেও বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও ব্যবহারিক দক্ষতার বিকাশ প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। এ ছাড়া শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিজ্ঞানাগার ও প্রযুক্তিসুবিধার অভাব রয়েছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেক তরুণ প্রয়োজনীয় কম্পিউটার দক্ষতা, যোগাযোগের সক্ষমতা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের ঘাটতির কারণে চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতি বদলাতে পরীক্ষায় বিশ্লেষণ, ব্যবহারিক কাজ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, ইন্টার্নশিপ ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি প্রযুক্তি, ভাষা ও পেশাভিত্তিক দক্ষতা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার সাফল্য শুধু পাসের হার বা সনদের সংখ্যায় নয়; শিক্ষার্থীরা কতটা দক্ষ ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠছে, তার ওপরও নির্ভর করে।
শিক্ষার্থীদের এসব মতামতে একটি বিষয় স্পষ্ট–শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হলে সনদ ও পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে।
