প্রায় একমাস ঢাকার বাসায় থাকলেন মা। আমি সেই ছোটবেলার ফিল করেছিলাম। কাউকে তা বুঝাতে পারবো না। কেমন লেগেছে। একেবারেই বৃদ্ধ মা। ছোট মানুষের মতো হাত ধরে ধরে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এরপরও মাঝে মাঝে মা আমাকে ধমক দিতেন। আনন্দ লাগতো। আমার কত সৌভাগ্য, মা আমাকে ধমক দিচ্ছেন। কত দিন হয় এ ধমক খাইনা।
সেদিন জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে করে ঢাকা আসছি। আমার আম্মা যা খেতে বলি, প্রথমবার না করবেন। পরে ঠিকই খাবেন। হয়তো খুশি করার জন্য। এ রোগটা আমার বাচ্চাদের মধ্যেও আছে। আম্মাকে হাত ধরে নিয়ে এসিরুমের বগিতে বসলাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিল করছি, আমি আমার জন্মদাত্রী মায়ের পাশে বসে আছি। মুহূর্তেই চোখ ভিজে এলো। আম্মার হাত ধরি, কিছু বলতে চাই। পারি না। খেয়াল করলাম, নিজের ছেলের পাশে বসে আম্মা খুব নিরাপদ বোধ করছেন। পান চিবুতে চাইলেন, আমি বের করে দিলাম।
ছোটবেলায় আম্মার গলায় একটা অপারেশন হয়েছিল। হাসপাতালে গিয়ে আম্মাকে ধরে খুব কেঁদেছিলাম। তখন আম্মা আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। 'দেখো আমার কিচ্ছু হবে না ইনশাআল্লাহ'।
রেলে ওঠে বুঝলাম, আম্মার এত কাছে বসে আমি দীর্ঘ সময় কখনো কাটাইনি। ছোটবেলার বিষয়টি আলাদা। প্রতিটি মুহূর্তই আমার ভালো লাগছিল।
মাকে নিয়ে বাসায় গেলাম। সবাই তিনতলা থেকে নেমে নিচে চলে এলো স্বাগত জানাতে। ছোট ছেলেটার বয়স তিন প্লাস। দাদুকে পেয়ে সবচেয়ে বেশি খুশি সে।
রাতে ডিনার সারতে বাসায় এলো বড় ছেলে আবির। আমি তাকে একটা টাকার নোট গিফট দিয়ে বললাম, তোমার দাদু বাসায় এসেছেন- এ খুশিতে দিলাম। ও মুচকি হেসে টাকাটা নিলো। সঙ্গে সঙ্গে বাকি দুইজনও এসে হাজির। তাদেরও দাদু বাসায় আসার গিফট লাগবে। আমি দিলাম। তারা খুশিতে নাচানাচি শুরু করলো। আমি মায়ের দিকে তাকালাম। দেখলাম, মায়ের চোখ আনন্দে ছলছল করছে। কী অদ্ভুত মায়েরা, অন্যের আনন্দে হন ভীষণ খুশি।
প্রতিদিন রাতে বাসায় বাদাম নিয়ে ফিরতামই। আমার জানা ছিলো না, আজ বিস্কিট শেষ হয়ে গেছে। একদম মধ্যরাতে ফিরলাম। তারা মা-শ্বাশুড়ি আমাকে নিয়ে একটু হাসাহাসি করলেন। ভাবলাম, বাদাম হয়তো প্রতিদিন আনার কারণে এমনটা বলছেন। বাদ ফজর বুঝলাম, বিষয়টা আদতে তা নয়। ঘরে বিস্কিট শেষ। এজন্য বাদাম নিয়ে হাসাহাসি। আমি জানি, আম্মা আমার মতোই বাদাম পছন্দ করেন।
৪ অক্টোবর ২০২৬ রোববার আবার জয়ন্তিকা ধরে বাড়ি চলে গেলেন। ঢাকার বাসাটা এখন কেমন আছে। আবারও হয়তো চোখ ভিজে আসবে। মা, মাই। জগতের অন্যকিছুর সঙ্গে তার তুলনা চলে না। বাবা আর মা- নিশ্চয়ই তারা আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক। আজকের শিক্ষক দিবসে সেনাসদস্যের মতো শাসন করে যিনি পড়াতেন-সেই বাবার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আমার পরমপ্রিয় মায়ের নেক হায়াত কামনা করছি। আমার সব গুরুজনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। যারা বেঁচে আছেন তাদের নেক হায়াত কামনা করছি। যারা চলে গেছেন তাদের জান্নাতে সুউচ্চ মাকাম চাই। আল্লাহ সবকিছুর মালিক। তিনি আমাদের জীবনকে সহজ করে দিন। আমিন
