যশোর প্রতিনিধি

যশোরে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ সংসদ সদস্য। বৃহস্পতিবার দুপুরে যশোর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা এসব অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে জেলা বিএনপি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা জামায়াতের আমির ও যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসূল। এ সময় তিনি প্রকাশিত ডিলার তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রমাণ পেশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, যশোরের ৯৩টি ইউনিয়ন ও আটটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগে ব্যাপক দলীয়করণ ও দুর্নীতি হয়েছে। সরকারদলীয় উপজেলা পর্যায়ের নেতা কর্মী এবং জেলা বিএনপির নেতাদের সহায়তায় অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অনেকে ডিলারশিপ পেয়েছেন। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন জামায়াত নেতারা।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, যশোরের পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য থাকলেও ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের পরামর্শ ও সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং জেলা প্রশাসক জেলা বিএনপির দেওয়া তালিকা অনুসারে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। এ ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।
জামায়াত নেতাদের অভিযোগ, মাদকসহ আটক এক কারবারির স্ত্রী, একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা কর্মী ও সমর্থকও ডিলারশিপ পেয়েছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার-বীজ মনিটরিং কমিটিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কৃষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা থাকলেও জামায়াতের সংসদ সদস্যদের কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি। এসব কমিটিতে বিএনপির নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি ডিলারশিপের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। জামায়াত নেতাদের দাবি, মনিরামপুর উপজেলার মেসার্স নাফিস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাসুদ পারভেজ রুবেল উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফিজুর রহমান মফিজের ছেলে। ঝাঁপা ইউনিয়নের মেসার্স লাকি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোলাম আলী স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ও অর্থের জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া শ্যামকুড় ইউনিয়নের মেসার্স জামান ট্রেডার্সের মালিক সালাউদ্দিন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির ছেলে বলে দাবি করা হয়। মেসার্স সরদার এন্টারপ্রাইজের মালিক তবিবর রহমান রুমু উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টুর খালাতো ভাই এবং সাবেক সংসদ সদস্য ইয়াকুব আলীর কর্মী বলে অভিযোগ করেন জামায়াত নেতারা। তাঁদের দাবি, দোকান না থাকা সত্ত্বেও তবিবর সার ডিলারশিপ পেয়েছেন।
চৌগাছা উপজেলায় মেসার্স চৌগাছা ট্রেডার্সের মালিক সেলিম রেজা আউলিয়া পৌর বিএনপির সভাপতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ করা হয়। অন্যদিকে, নওয়াপাড়ার মেসার্স মনিরুল ফারাজীর মালিক বিএম মনিরুল আলম ফারাজী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিয়ার ফারাজীর ছেলে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ৯৩টি ইউনিয়নেই বিএনপির নেতাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে এবং তালিকায় আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা কর্মীদের নামও রয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অধ্যাপক গোলাম রসূল বলেন, ‘সার-বীজ মনিটরিং কমিটি গঠন ও ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।’ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিতে কৃষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গোলাম রসূল বলেন, ‘আমি কৃষি মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য। আমি যশোরের জেলা প্রশাসককে স্পষ্ট বলেছি, আমরা এখানে পাঁচজন এমপি আছি, কেন জেলা পর্যায়ের তিনজনের মধ্যে আমার একজন লোক রাখা হয়নি? তখন ডিসি বলেছেন, সরকারের নির্দেশমতো তিনি কাজ করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট বলেই দিয়েছেন, এই ডিলারশিপ বিএনপি ছাড়া কেউ পাবে না। কারণ ১৫ বছর ধরে বিএনপি নির্যাতিত হয়েছে, নিষ্পেষিত হয়েছে, কারাগারে গেছে। তাহলে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদীদের কাছে নির্যাতিত হয়েছে শুধুই বিএনপি! এই যশোরে ১২ শ’ মামলায় জামায়াতের হাজার হাজার কর্মী ছিল। আমরা বছরের পর বছর বাড়িছাড়া থেকেছি।’
জামায়াতের এই নেতা দাবি করেন, তাঁদের পক্ষ থেকে প্রকৃত ব্যবসায়ী, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও তাঁদের কোনো নেতা কর্মীকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়নি। তিনি সার ডিলার নিয়োগে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
অভিযোগের বিষয়ে যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘তাদের অভিযোগ অসংলগ্ন। এটা সঠিক যে, আবেদন আমাদের নেতা কর্মীরা বেশি করেছে। পেয়েছেও বেশি। তবে যাচাই-বাছাই করেছে জেলা প্রশাসন। নীতিমালা অনুযায়ী সঠিক না থাকলেও তো তারা ডিলার পায়নি। আমরা দলীয়ভাবেও কোনো হস্তক্ষেপ করিনি। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিরোধী দল সবকিছুতেই বিরোধিতা করতে হয়; তাই জামায়াত করছে।’
এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য আজীজুর রহমান, যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোক্তার আলী, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু জাফর সিদ্দিকী ও প্রচার সম্পাদক শাহাবুদ্দিন বিশ্বাসসহ দলটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

