গঠনমূলক বিরোধিতা করুন, স্বৈরাচার ফেরার পথ খুলবেন না: প্রধানমন্ত্রী
রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও আধুনিকায়িত উদ্যানের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচার ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করা হলে তা হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি।
সোমবার সকালে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বিরোধী দল অবশ্যই সরকারের বিরোধিতা করবে, তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করার পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করছে। দেশের স্বার্থ ও জনকল্যাণে সংসদে আলোচনা, যুক্তিতর্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই সরকারি ও বিরোধী দলের মূল দায়িত্ব।
তিনি বলেন, সরকারি দলই শুধু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে কিংবা বিরোধী দলই কেবল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, চিকিৎসাসেবা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।
জুলাইয়ের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সম্মান জানাতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ সবার রয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যাঁরা রাজনৈতিক পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁদের প্রতি সম্মান জানানো উচিত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণের অর্থ হলো, আত্মত্যাগকারীদের পাশে থাকা এবং তাঁদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করা।
তারেক রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মিল রয়েছে। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করাও তাঁদের প্রত্যাশার অংশ ছিল।
বিএনপি সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ধাপে ধাপে কাজ করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
উন্নয়নের সঙ্গে প্রকৃতি সংরক্ষণের তাগিদ
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের প্রয়োজন ও দেশের উন্নয়নে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রকৃতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। বিদ্যমান গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচ্ছন্নতার অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও সরকারি হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে আরও মনোযোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীরা যাতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা নিতে পারেন, সে জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের আরও সচেতন হতে হবে।
একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যানের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং এসব স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণে নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করেন।
উদ্বোধন হলো ৯০ ফুট উঁচু জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ
এর আগে সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যান ঘুরে দেখেন। এ সময় উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগারও পরিদর্শন করেন তিনি।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি ৯০ ফুট উঁচু এবং প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এতে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। এসব ভাস্কর্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
২৩ একরজুড়ে আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যান
পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা ও জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
