‘ভোররাতে চালক গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়ছিলেন। তিনি বাম লেন থেকে ডান লেনে চলে গেলে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এরপর আমাদের চেতনা ফিরলে দেখি, কয়েকজন আমাদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও পকেটের টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। বাসের মধ্যে আটকে থাকায় আমরা কিছুই বলতে পারছিলাম না। তবে কিছু মানুষ ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সঙ্গে আমাদের উদ্ধারে সহযোগিতাও করেছেন।’
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে চোখ মুছতে মুছতে এভাবেই নাটোরের বনপাড়ায় ভয়াবহ বাস-ট্রাক দুর্ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন বেঁচে ফেরা যাত্রী সোহেল রানা।
মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র এলাকায় বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেয়ার পর আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় বাবা-মেয়েসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।
নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম জানান, ট্রাকটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ট ২২-৬২০৬ এবং বাসটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব ১২-৪৪৪৫। সংঘর্ষের পর উদ্ধারকর্মীরা আহতদের নাটোর সদর হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠান।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিদখালী গ্রামের শহীদুল ইসলাম (৪৫) ও তার আট বছর বয়সী মেয়ে তাছফিয়া খাতুন। এছাড়া রাজশাহী, শরীয়তপুর, ঝিনাইদহ, নওগাঁ ও ফরিদপুরের বাসিন্দারাও নিহত হয়েছেন।
নিহত অন্যরা হলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের আনোয়ারুল হক (৩০), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জুয়েল (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের সোহাগ শিকদার (৩০), জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে আব্দুস সালাম মোল্লা (৪৬), আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), পালের চর গ্রামের শাহীন আহমেদ (৩২), ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়ীয়া গ্রামের ট্রাকচালক আবু কালাম (৫৫), নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের রাসেল (৩৩) এবং ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখোন্দিয়া গ্রামের হিমেশ জমাদার (৩৫)।
বনপাড়া ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।
দুর্ঘটনার পর আহত যাত্রীদের মালামাল লুটের অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, পুলিশ দেড় লাখ টাকা ও কিছু মালামাল উদ্ধার করেছে। সেগুলো আহত ও নিহতদের স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে।
নিহতদের মরদেহ বনপাড়া হাইওয়ে থানায় নেয়ার পর সেখানে স্বজনেরা আসতে শুরু করেন। পরে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আলমগীর হোসেন জানান, নিহত ১২ জনের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বজনেরা যেসব মালামাল শনাক্ত করেছেন, সেগুলোও তাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।
নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার জানান, নিহতদের স্বজনদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জানান, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।
