মুম্বাইয়ে বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর কারাবন্দী গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অপরাধ নেটওয়ার্ক, বিদেশি হ্যান্ডলারদের ভূমিকা এবং ভিআইপিদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো নিয়ে ফের জোর তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জেলের আড়ালে থাকলেও একের পর এক হামলা, চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির নেপথ্যে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম উঠে আসছে। কারাগারের দেয়াল ভেদ করে কীভাবে এই সিন্ডিকেট শুটার নিয়োগ করে এবং অপরাধ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
গত রবিবার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহু এলাকার একটি ফুটবল গ্রাউন্ড থেকে বের হওয়ার সময় ৩৬ বছর বয়সী অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, ধীরগতিতে চলতে থাকা গাড়ির সামনের আসন লক্ষ্য করে অন্তত দুজন দুষ্কৃতকারী খুব কাছ থেকে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। এতে অভিনেতার গাড়িচালকসহ দুইজন আহত হন। অবশ্য টাইগার শ্রফ অক্ষত রয়েছেন। এ ঘটনায় সোমবার রাজস্থান থেকে তিন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ।
বিদেশে বসে যেভাবে পরিচালিত হয় এই নেটওয়ার্ক
বিভিন্ন মাধ্যম ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অপরাধ চক্রটি বেশ কয়েকটি স্তরে কাজ করে। যার ফলে যারা টার্গেট নির্ধারণ করে বা হামলার পরিকল্পনা করে, তাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে হামলা চালাতে যাওয়া শুটারদের কখনোই সরাসরি দেখা বা পরিচয় হয় না।
সাধারণত বিদেশে অবস্থানরত একজন হ্যান্ডলার ওপর থেকে নির্দেশনা পাঠান। এরপর স্থানীয় সহযোগীরা সেই অনুযায়ী অর্থ, অস্ত্র, বাসস্থান ও নজরদারির (রেকি) ব্যবস্থা করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শুটাররা হামলা চালিয়ে পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী আত্মগোপনে চলে যায়। স্তরীভূত এই ব্যবস্থার ফলে সিন্ডিকেটের শীর্ষ নেতারা সবসময় নিরাপদে থাকে।
এমনকি কোনো শুটার অস্ত্র সরবরাহকারীকে চিনলেও এই হামলার মূল অর্থায়নকারী কে, তা সে জানতে পারে না। ২০২৪ সালের এপ্রিলে সালমান খানের বাসভবন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গুলিবর্ষণের ঘটনার তদন্তেও ঠিক একই ধরনের জটিল কাঠামোর প্রমাণ মিলেছিল।
হামলাকারীদের পলায়ন ও রাজস্থানে গ্রেপ্তার
টাইগার শ্রফের ওপর হামলার পর অভিযুক্তরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে স্থান পরিবর্তন করে। মুম্বাই পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে রাজস্থানের কোটা জংশন থেকে পুলিশ তিন সন্দেহভাজনকে আটক করে। কোটার পুলিশ সুপার তেজস্বিনী গৌতম জানান, সাদা পোশাকের পুলিশ টিম মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে রেলস্টেশন ঘেরাও করে তাদের ধরে ফেলে।
মৌলিক তদন্তের বরাতে মুম্বাই অপরাধ শাখার ডিসিপি রাজতিলক রশন জানান, অপরাধীরা হামলার পর অন্ধেরী পশ্চিম রেলস্টেশনের কাছে তাদের মোটরসাইকেলটি ফেলে রেখে লোকাল ট্রেনে চেপে বরিবলি যায়। সেখান থেকে ট্যাক্সিযোগে সুরাট পৌঁছে তারা জয়পুর এক্সপ্রেসে ওঠে। সেখান থেকেই তাদের আটক করে কোটা পুলিশ। আটককৃতদের আদালতে হাজির করা হবে।
কে এই অনিল পন্ডিত?
টাইগার শ্রফের ওপর হামলার দায় স্বীকার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অনিল পন্ডিত নামে এক গ্যাংস্টারের অডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এতে সে ও হারমান সান্ধু মিলে এই হামলার পরিকল্পনা করেছে বলে দাবি করা হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, টাইগার শ্রফ আগের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিলেন এবং সালমান খানের সঙ্গে কাজ করা অন্যান্য বলিউড ব্যক্তিত্বদের হুমকি দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে অভিনেতা সালমান খানকে লরেন্স বিষ্ণোই ও পুরো বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়।
হরিয়ানার পানিপথের বাসিন্দা অনিল পন্ডিত ২০২৪ সালে বেআইনি উপায়ে ('ডংকি' রুট ব্যবহার করে) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। ভারত ছাড়ার সময় তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকলেও পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয়। আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা এফবিআই এই পুরো গ্যাংকে 'লরেন্স বিষ্ণোই অর্গানাইজড ক্রাইম গ্রুপ' (OCG) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই চক্রটি নিজেদের কর্মকাণ্ড চালানের জন্য নিয়মিতভাবে বড় বড় ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করে থাকে।
সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ড
এর আগে ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সাবেক রাজ্যমন্ত্রী বাবা সিদ্দিকীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দুষ্কৃতকারীরা। এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ছয় মাস আগেই সালমান খানের বাড়ির সামনে গুলি চালানো হয়েছিল। এই দুই ঘটনাই মুম্বাইয়ের রাজনৈতিক ও বিনোদন জগতে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের ভয়াল উপস্থিতির বিষয়টি স্পষ্ট করে।
বাবা সিদ্দিকী অভিনেতা সালমান খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে থাকা অবস্থাতেই তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পরপরই গ্যাংয়ের একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে হামলার দায় স্বীকার করা হয়। সেই তদন্তে পুলিশ লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে মোহাম্মদ জিশান আখতারসহ একাধিক পরিকল্পনাকারীর নাম সামনে আনে।
তবে সিদ্দিকীর পরিবার এটি কেবল গ্যাংয়ের শত্রুতা নাকি বান্দ্রার বস্তি পুনর্বাসন ও জমি সংক্রান্ত কোনো গভীর চক্রান্ত, তা খতিয়ে দেখতে বিস্তৃত তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সূত্র: আউটলোক
আজহার/
