স্মার্টফোনে কয়েক মিনিটের জন্য টিকটক খুলেছেন। উদ্দেশ্য ছিল শুধু কিছু ভিডিও দেখা। কিন্তু হঠাৎ চোখে পড়ল পছন্দের একটি পোশাক, কোনো গ্যাজেট কিংবা ঘরের প্রয়োজনীয় একটি পণ্য। এত দিন এমন কিছু পছন্দ হলে পণ্যটির তথ্য জানতে বা কিনতে অন্য ওয়েবসাইটে যেতে হতো। এবার সেই ঝামেলাও কমিয়ে আনছে টিকটক। ভিডিও দেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি কেনাকাটাকে যুক্ত করতে নতুন দুটি ফিচার চালু করেছে জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মটি।
সোমবার ৫ অক্টোবর নতুন ফিচারগুলোর ঘোষণা দেয় টিকটক। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ‘শপিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’ এবং অ্যাপের ভেতরেই সরাসরি পণ্য কেনার সুবিধা। ফলে ব্যবহারকারীর জন্য পণ্য খোঁজা থেকে শুরু করে কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ করার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। টিকটকের নতুন শপিং অ্যাসিস্ট্যান্ট মূলত একটি কথোপকথনভিত্তিক এআই সহকারী। কোনো পণ্য সম্পর্কে ব্যবহারকারী জানতে চাইলে এটি সেই পণ্যের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরতে পারবে। পণ্যের বৈশিষ্ট্য, মজুত আছে কি না, আকার বা মাপ এবং সরবরাহসংক্রান্ত তথ্য জানানো থেকে শুরু করে প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিতেও সহায়তা করবে এই এআই; অর্থাৎ ব্যবহারকারীকে শুধু নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের নাম লিখে খুঁজতে হবে এমন নয়। নিজের প্রয়োজন বা পছন্দের কথা জানালেও এআই সহকারী সেই অনুযায়ী পণ্য খুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করবে। ব্যবহারকারীর আগ্রহ ও পছন্দের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে পরামর্শ দেওয়ার সক্ষমতাও থাকবে এতে।
ধরা যাক, কেউ টিকটকে একটি ভিডিও দেখছেন এবং ভিডিওতে থাকা কোনো পণ্য তার পছন্দ হলো। আগে সেই পণ্যের নাম বা ব্র্যান্ড খুঁজে আলাদা ওয়েবসাইটে যেতে হতে পারত। নতুন সুবিধার ফলে সেই পথ অনেকটাই ছোট হয়ে আসবে। ‘ফর ইউ’ ফিডে ভিডিও দেখার সময়ই কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য পছন্দ হলে সেটি সরাসরি কেনার সুযোগ থাকবে।
নতুন এক-ক্লিক কেনাকাটার সুবিধার ফলে ব্যবহারকারীকে আর আলাদা ওয়েবসাইটে গিয়ে পণ্য খুঁজতে হবে না। একই প্ল্যাটফর্মে থেকে পণ্যের বিস্তারিত তথ্য দেখা এবং পছন্দ হলে কেনাকাটা করার সুযোগ পাওয়া যাবে। এতে ভিডিও দেখা ও কেনাকাটার মধ্যকার দূরত্ব আরও কমে আসবে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে টিকটক মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে চাইছে। এত দিন ব্যবহারকারীর বিনোদন ও পণ্য আবিষ্কারের জায়গা হিসেবে টিকটক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই পণ্য আবিষ্কারের পর সরাসরি কেনাকাটার পথও তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন সেবা চালু করতে বিভিন্ন ই-কমার্স ও ডিজিটাল পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে টিকটক। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সেলসফোর্স, শপিফাই ও স্ট্রাইপ। এর মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, অনলাইন স্টোর পরিচালনা এবং অর্থ পরিশোধের মতো বিষয়গুলোকে আরও সহজভাবে টিকটকের কেনাকাটার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এত দিন টিকটকের ই-কমার্স কার্যক্রম মূলত ‘টিকটক শপ’কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই পরিসর আরও বাড়ানো হচ্ছে, অর্থাৎ শুধু নির্দিষ্ট শপিং অংশ নয়, অ্যাপের অন্যান্য জায়গায় ভিডিও দেখার সময়ও ব্যবহারকারীদের সামনে কেনাকাটার সুযোগ তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কার্যক্রম ব্যবসাগুলোর জন্য প্রায় ৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকা- সৃষ্টি করেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা টিকটকের ভিডিও দেখে কোনো না কোনো পণ্য কিনেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক শপ চালু হয়েছিল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কেনাকাটার বাজারে এর প্রভাব বাড়তে থাকে। বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইমার্কেটারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক শপের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারের পণ্য বিক্রি হয়েছে, যা দেশটির মোট সোশ্যাল কমার্স বিক্রির প্রায় ১৮ শতাংশ। ফলে টিকটকের নতুন এই উদ্যোগকে শুধু একটি নতুন ফিচার হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর মাধ্যমে ভিডিও, কনটেন্ট, পণ্য আবিষ্কার এবং অনলাইন কেনাকাটাকে একই অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে প্ল্যাটফর্মটি। প্রযুক্তির এই পরিবর্তন অনলাইন কেনাকাটার অভ্যাসকেও নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আগে যেখানে ক্রেতাকে পণ্য খুঁজতে আলাদা করে অনলাইন শপে যেতে হতো, সেখানে এখন কনটেন্ট দেখার মধ্যেই পণ্য সামনে চলে আসছে। আর এআই সহকারী যুক্ত হওয়ায় পণ্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ভূমিকা আরও বাড়ছে। টিকটকের নতুন উদ্যোগ তাই শুধু কেনাকাটাকে সহজ করার বিষয় নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের সময় কাটানো এবং কেনাকাটার অভ্যাসের মধ্যকার সীমারেখাকেও আরও অস্পষ্ট করে দিচ্ছে।
