জালালাবাদ রিপোর্ট: আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে পিটিয়ে হত্যা, নির্যাতন কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান দখলে নিতে সংঘবদ্ধ হামলা দেশে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে মব সন্ত্রাসের এমন ভয়ংকর রূপ। কখনও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, কখনও চুরি কিংবা নানা গুজবকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতার হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। আবার ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে মব। উদ্বেগজনক হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও কোথাও কোথাও হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও উঠছে পুলিশের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে এসব ঘটনায় মামলা হলেও বিচার সম্পন্ন ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার নজির খুবই কম। ফলে মব সন্ত্রাসের বিস্তার ঠেকানোর পাশাপাশি আইনের শাসন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে ১৫২ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের একই সময়ে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মব সন্ত্রাসে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে ১৯টি, বৃদ্ধির হার প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। হত্যাকাণ্ডের প্রায় অর্ধেক ঘটনাই রাজধানী ঢাকায়। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও খুলনায় মবের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের হার বেশি। আর মব সন্ত্রাসে সবচেয়ে কম হত্যা ঘটছে সিলেটে। মানবাধিকার সংগঠন, পুলিশ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে পিটিয়ে হত্যার সংখ্যা ১২৮ জন, ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা ছিল ৫১, ২০২২ সালে ৩৬ , ২০২১ সালে ২৮ ও ২০২০ সালে সংখ্যা ছিল ৩৫ জন। তবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মবের মাধ্যমে পিটিয়ে মারার ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৮ জনে। আর গত বছরের প্রথম ৯ মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ১৫২ জন। মব সন্ত্রাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বর্তমান সরকারের সময়ও বেড়েই চলছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে মব সন্ত্রাসে হত্যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭১ জনে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আইন আদালতকে পাশ কাটিয়ে পরিকল্পিত মব সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে মানুষ। মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এর ফলে দিন দিন মব সন্ত্রাসের ঘটনা বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘটনা চলমান থাকার দায় সরকার এড়াতে পারে না বলেও মন্তব্য তাদের।
মব সন্ত্রাসের কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও হামলাকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হিসাবে দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা কিংবা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ বাহিনীর সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। চাপের মুখে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে সহযোগিতা করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমে ‘ধর্ম অবমাননার অভিযোগ’ তুলে মব সৃষ্টি করে গত মঙ্গলবার পিটিয়ে হত্যা করা হয় সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে। প্রথম দফায় পিটুনির পর ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে আবার তার ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয়রা বলছেন, শামীমের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ তুলে ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তি ফেইসবুকে সরাসরি লাইভ করেন। দীর্ঘ সময় হত্যাকাণ্ডের উসকানি দিলেও পুলিশ পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এর আগে গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমের দরবারে একদল লোক হামলা চালায় এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে গুজব, সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি এবং তাৎক্ষণিক জনরোষ পরিস্থিতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করে না; তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টহল, বিট পুলিশিং জোরদার, দ্রুত রেসপন্স টিম মোতায়েন, গুজব প্রতিরোধে সাইবার মনিটরিং এবং মব সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম চলমান।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্রকেই তুলে ধরে। আইন প্রয়োগ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার কারণে গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে যায়। দিনের পর দিন এসব ঘটনা বাড়লেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে না নেওয়ায় ঘটনা আরও বাড়ছে। আর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। গণপিটুনি আইনের দৃষ্টিতে ‘হত্যা’ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা হত্যাকারী।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলছেন, স্বার্থের ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা থেকে মব তৈরি হচ্ছে। সেই ক্ষোভ আর স্বার্থ থেকে গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটছে। মব আটকাতে পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে। তবে সরকারকে মব প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে কঠোর বার্তা দিতে হবে। গণপিটুনির মতো অপরাধে অংশ নিলে আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো তার নেতাকর্মীদের বহিষ্কারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলেই এই ধরনের ঘটনা কমে আসবে।
মামলা হলেও শাস্তি বিরল : মব সন্ত্রাসের বিস্তার ঠেকানোর ক্ষেত্রে বিচারহীনতার অভিযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ ঘটনায় মামলা হলেও আলোচনায় না এলে পুলিশের তেমন তৎপরতা থাকে না। সেই মামলার তদন্ত বিচার ঝুলে থাকে বছরের পর বছর।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, গণপিটুনির ঘটনায় মামলা হলেও বিচার হওয়ার নজির কম। ২০১১ সালের ১৭ জুলাই শবেবরাতের রাতে ঢাকার পাশেই আমিন বাজারের বড়দেশি গ্রামে ছয় ছাত্রকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। সেই হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পর আদালত ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনকে কারাদণ্ডের আদেশ দেন; কিন্তু এখনও অপরাধীদের শাস্তি কার্যকর হয়নি। ২০১৯ সালের ২০ জুলাই সকালে বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তাসলিমা বেগম রেণু নামে এক নারীকে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনা বেশ আলোচিত হলেও এখন পর্যন্ত ওই হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। হৃদয় ইসলাম মোল্লা নামে এক আসামিকে ২০২৪ সালে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেও কার্যকর হয়নি। বিচার না হওয়ায় এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
