বলিউড অভিনেতা সালমান খানকে ‘চলচ্চিত্রশিল্পের একমাত্র টাইগার’ বলে প্রশংসা করেছিলেন টাইগার শ্রফ। ২০২২ সালে একটি সিনেমার প্রচার অনুষ্ঠানে দেওয়া সেই বক্তব্যই অভিনেতার ওপর হামলার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছে এক অভিযুক্ত। তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে হামলার সরাসরি যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৮ অক্টোবর মুম্বাইয়ের জুহুতে একটি খেলার মাঠ থেকে ফুটবল খেলে বের হওয়ার সময় টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুই হামলাকারী। অভিনেতার বিএমডব্লিউ গাড়ি লক্ষ্য করে সাতটি গুলি ছুড়ে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় টাইগারের গাড়িচালক ও এক পথচারী আহত হন।
পরে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের এক সদস্য হামলার দায় স্বীকার করে। ঘটনার পরদিন রাজস্থানের কোটা রেলস্টেশনে সুরাট থেকে জয়পুরগামী একটি ট্রেন থেকে তিন সন্দেহভাজন হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সালমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে হামলা?
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এক অভিযুক্ত দাবি করেছে, ২০২২ সালে একটি সিনেমার প্রচার অনুষ্ঠানে টাইগার শ্রফ সালমান খানকে ‘ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র টাইগার’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সালমানের প্রশংসা করে দেওয়া সেই বক্তব্য হামলার পরিকল্পনার অন্যতম কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। সালমান খানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বা তার প্রতি সমর্থনের কারণে এর আগেও বিভিন্ন ব্যক্তিকে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সালমানের সঙ্গে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিরোধের সূত্রপাত ১৯৯৮ সালে রাজস্থানে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলাকালে কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। ১৯৯৯ সালে এই ঘটনায় সালমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। কৃষ্ণসার হরিণ বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। এই ঘটনার পর থেকেই লরেন্স বিষ্ণোই সালমানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন এবং তাকে হুমকি দিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তদন্তের খবর অনুসরণ করছিলেন অভিযুক্তরা
তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশের ধারণা, অভিযুক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ রাখছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে রেহান নামের এক অভিযুক্তকে বারবার মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য ইন্টারনেট কলের মাধ্যমে অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পুলিশের সন্দেহ, হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি আন্ধেরিতে খুঁজে পাওয়ার খবর এবং অভিযুক্তদের ট্রেনে যাত্রার তথ্যও বার্তার মাধ্যমে হামলাকারীদের জানানো হয়েছিল।
পুলিশের চোখ এড়াতে অভিযুক্তরা মোটরসাইকেল, ট্রেন ও ক্যাব ব্যবহার করে যাতায়াত করেন। তবে মুম্বাই পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোটা পুলিশ জয়পুরগামী ট্রেন থেকে তিন প্রধান সন্দেহভাজনকে আটক করে।
যেভাবে ধরা পড়ল পালানোর পথ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, হামলার পর অভিযুক্তরা নিজেদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পুরো পরিকল্পনায় হামলাকারী ও তাদের সহযোগীরা ইন্টারনেটভিত্তিক ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল (ভিওআইপি) কল ব্যবহার করেছিলেন বলে সন্দেহ পুলিশের। তবে অভিযুক্তরা একটি সাধারণ মোবাইল ফোনে কল করেছিলেন, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। ওই কলের সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পারে, মুম্বাইয়ের বোরিভলি থেকে সুরাট যাওয়ার জন্য একটি বেসরকারি ক্যাব ভাড়া করেছিলেন তারা।
গুলি চালানোর পর আন্ধেরি থেকে লোকাল ট্রেন ধরে বোরিভলি যান অভিযুক্তরা। সেখান থেকে ক্যাবে সুরাটে পৌঁছান। ক্যাবচালকের কাছে করা ফোনকলটি পুলিশের নজরে আসার পর তাদের যাত্রাপথ শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পরে মুম্বাই পুলিশের অ্যান্টি-এক্সটরশন সেলের একটি দল বোরিভলি থেকে সুরাটে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে ক্যাবচালক জানান, তিনি অভিযুক্তদের সুরাট রেলস্টেশনে নামিয়ে দিয়েছিলেন।
রেলস্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ ও সংরক্ষিত আসনের তালিকা পরীক্ষা করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, অভিযুক্তরা জয়পুরগামী একটি ট্রেনে উঠেছিলেন। এরপর কোটা-জয়পুর রুট অনুসরণ করে রাজস্থানের কোটায় তাদের আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, ওই একটি সাধারণ ফোনকলের সূত্র না পেলে সুরাট পর্যন্ত অভিযুক্তদের যাত্রাপথ শনাক্ত করা আরও কঠিন হতো। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে দুই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনায় গুজরাটের সুরাট থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০টি জীবন্ত কার্তুজ উদ্ধার করেছে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা।
হামলার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত টাইগার
গত ১৮ অক্টোবরের হামলার ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন টাইগার শ্রফ। মুম্বাই পুলিশের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিনেতা জানিয়েছেন, গাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় তিনি হতবাক এবং কারও সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা নেই। হামলাকারীরা কারা, কেন তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে কিংবা কার নির্দেশে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, এসব বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। এক অপরাধ দমন শাখার কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় এখনো টাইগার শ্রফের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য রেকর্ড করা হয়নি। শিগগিরই তার বক্তব্য নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সূত্র: এনডিটিভি
