বিকেলের রোদের তেজ কমে আসছে। চারদিকে গুমোট ভাব, একটু পরেই হয়তো বৃষ্টি নামবে। দাদিমা বারান্দায় মাদুর পেতে কাঁথা সেলাই করছিলেন। ছোট্ট রাফসান বাইরে থেকে একছুটে দৌড়ে এসে তাঁর কোল ঘেঁষে বসল। দাদি শাড়ির আঁচল দিয়ে নাতির কপালের ঘাম মুছতেই সে আবার উঠে দাঁড়াল। ডানপিটে বলে কথা! দুষ্টুমির ছলে পিঁপড়ার সারির দিকে তাকিয়ে পা বাড়িয়ে বলল, ‘দাদিমা, এগুলো পা পিষে মেরে ফেলি?’
দাদিমা তাড়াতাড়ি ওর হাত চেপে ধরে বললেন, ‘আহা, ওদের মারিস না দাদুভাই। দেখ না, একটা খাবারের টুকরো কত কষ্ট করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে!’
রাফসান মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘এতে আবার কষ্টের কী হলো? সারাদিন দেখি ওরা এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়।’
দাদিমা মাথা তুলে বললেন, ‘কী বলিস, শুধু ঘোরে নাকি! তুই কী বুঝবি, বসে বসে খাস তো! দেখ, কী পরিশ্রম করে খাবার জোগাড় করছে। একটু পরেই বৃষ্টি নামবে, তখন তো আর বের হতে পারবে না। তাই আগেভাগেই যা পায়, সব নিজেদের ঘরে নিয়ে জমিয়ে রাখে। ওরা ছোট, ওদের কাজ কিন্তু ছোট্ট নয়। সবাই মিলেমিশে কাজ করে। বড় কাজও ওদের কাছে কঠিন লাগে না।’
রাফসান আবার ত্যাড়ামি করে বলল, ‘এদের গায়ে কোনো জোর আছে কী যে পরিশ্রম করবে?’
দাদিমা পিঁপড়ার সারির দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, ‘বাহ! কী সুন্দর, সবাই মিলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বড় একটা খাবারের টুকরো।’
রাফসান এবার ভালো করে তাকাল। সত্যিই তো, কয়েকটা পিঁপড়া মিলে একটা বড় খাবারের টুকরো টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সেটি এদিক-ওদিক কাত হয়ে যাচ্ছে, তবু কেউ ছেড়ে দিচ্ছে না।
ঠিক তখনই এলো একটা বাতাসের ঝাপটা। আমগাছের শুকনো পাতাগুলো খড়খড় শব্দ করে উঠোনে ঝরতে লাগল। পিঁপড়াদের সারি খানিকটা এলোমেলো হয়ে গেল। কিন্তু আশ্চর্য, কিছুক্ষণ পরই তারা আবার আগের মতো চলতে শুরু করল।
রাফসান অবাক হয়ে বলল, ‘দাদিমা, মাটির নিচে দানা রাখলে তা পচে যায় না?’
তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘ওসবেরও ব্যবস্থা আছে ওদের কাছে। পিঁপড়া কিন্তু খুব চালাক। শস্যদানা ওরা এমনভাবে রাখে, যেন পচে না যায়।’
রাফসানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
‘তাহলে পিঁপড়ারা কি অনেক কিছু বোঝে?’
‘হ্যাঁ, বোঝে বলেই তো এত দিন ধরে টিকে আছে।’
আকাশটা আরও কালো হয়ে এলো। মেঘ গর্জে উঠল। হালকা বৃষ্টি শুরু হতেই উঠোন ভিজে গেল।
দাদিমা কাঁথাটা গুটিয়ে নিয়ে বললেন, ‘চল, এবার ঘরে যাই। ভিজে যাবি।’
রাফসান দাদিমার পেছনে ছুটল, কিন্তু যাওয়ার আগে আরেকবার পিঁপড়াদের দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত আগেও ওদের সে পিষে মারতে চেয়েছিল। এখন তাদের জন্য কেমন যেন মায়া লাগছে।
পিঁপড়ার দলটা বড় খাবারের টুকরোটি নিয়ে মাটির গর্তে মিলিয়ে গেল। রাফসান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বিকেলের সেই পিঁপড়ার সারিটা যেন তার চোখে আর আগের মতো ছোট মনে হলো না। তারপর সে দাদিমার হাত ধরে ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল। বাইরে তখন ঝুমঝুম বৃষ্টি।
The post পিঁপড়েদের ছোট সংসার appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
