ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসুর উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে একাডেমিক পরিসরে বুলিং, ক্ষমতার অপব্যবহার, ইসলামবিদ্বেষ ও শ্রেণিগত বৈষম্যের অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীদের মর্যাদা, অধিকার ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন আলোচকেরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিসরে ক্ষমতার অসমতা, শিক্ষকদের ক্ষমতার অপব্যবহার, এলিটিজম, ইসলামবিদ্বেষ, শ্রেণিগত ও বর্ণবাদী বৈষম্য এবং শিক্ষার্থীদের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার বিষয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে ‘বুলিং বনাম একাডেমিক স্বাধীনতা: আরোপ ও অপরায়ণের রাজনীতি’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও গবেষক ডা. ফাহমিদ উর রহমান, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং লেখক ও গবেষক জান্নাতে গুলশান।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক এবং ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে ছালমা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনির।
আলোচনায় ডা. ফাহমিদ উর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিসরে ক্ষমতার অসমতা ও এলিটিজমের চর্চার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের মানবিক মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমানাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রও। ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলার পাশাপাশি যারা শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা ও অধিকার খর্ব করেন, তাঁদের এমন আচরণের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, উদারনৈতিকতার চর্চার আড়ালে কখনো কখনো ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব এবং মুসলিম শিক্ষার্থীদের প্রতি অবমাননাকর আচরণ প্রকাশ পেতে পারে। শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা, পোশাক-পরিচ্ছদ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে অপমান ও বৈষম্যের অভিযোগও আলোচনায় উঠে আসে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, মুসলিম সমাজে শিক্ষাবিস্তারে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক পটভূমি, ক্ষমতার কাঠামো এবং একাডেমিক পরিসরে পরিচয় ও বৈষম্যের প্রশ্ন গুরুত্ব পায়।
লেখক ও গবেষক জান্নাতে গুলশান বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিসরে ইসলামি প্রতীক ও ধর্মীয় পোশাককে নেতিবাচকভাবে বিবেচনা করার প্রবণতা এবং পোশাকের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি ধর্মীয় পরিচয় ও পোশাক নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমূলক মনোভাবের অবসানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বুলিং, শ্রেণিগত বৈষম্য ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ
সেমিনারে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে শ্রেণিগত বৈষম্য, অপমানজনক মন্তব্য এবং শিক্ষকদের আচরণে পেশাগত ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো আলোচিত হয়। শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে কটাক্ষ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য এবং পোশাক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হেয় করার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এসব আচরণ শিক্ষার্থীদের মানবিক মর্যাদা ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।
সেমিনারের সভাপতি উম্মে ছালমা ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বুলিং, ইসলামবিদ্বেষ, শ্রেণিগত বৈষম্য ও বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ তুলে ধরেন। পাশাপাশি এসবের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন। বিশেষ করে, রেড কার্ড প্রদর্শন ও কালো মাস্ক পরিধানের মাধ্যমে প্রতিবাদ এবং বৈষম্যহীন ও মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার দাবির বিষয়টি আলোচনায় স্থান পায়।
বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক একাডেমিক পরিবেশের আহ্বান
সেমিনারে বক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ককে মর্যাদাপূর্ণ, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা, শিক্ষকদের পেশাগত আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
বক্তারা বলেন, একাডেমিক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মর্যাদা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করাও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বের অংশ।
অনুষ্ঠান শেষে সেমিনারের সভাপতি উম্মে ছালমার পক্ষ থেকে ডা. ফাহমিদ উর রহমান রচিত ‘ফ্রানজ ফানোঁ, হিজাব ও ঔপনিবেশিকতা’ বইয়ের ১০০টি কপি বিতরণ করা হয়।
সেমিনারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশে বুলিং ও বৈষম্যের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে।
