আবুধাবিতে সহজ জীবনের আশা নিয়ে পাড়ি জমাননি মোহাম্মদ ওয়াহিদ। নিজের এবং পরিবারের জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেই তিনি দেশ ছেড়েছিলেন।
তিনি মাত্র ৭০০ দিরহামে একজন ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেন। নিজের ভিসার খরচ নিজেই বহন করার কারণে পরিবার থেকে দূরে নতুন দেশের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাকে অত্যন্ত হিসাব করে সীমিত আয়ের ওপর চলতে হয়েছিল।
প্রথম কয়েক বছর বেশ কঠিন ছিল, তবে ওয়াহিদ তার এই অবস্থাকে নিজের অর্জনের ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা না ভেবে বরং একটি দীর্ঘ যাত্রার শুরু হিসেবে দেখেছিলেন।
আরও পড়ুন
ওয়াহিদ বলেন, ‘আমি কখনো এটিকে কষ্ট হিসেবে দেখিনি। আমি এটিকে শুরুর রেখা হিসেবে দেখেছিলাম।’
ইলেকট্রিশিয়ান থেকে উদ্যোক্তা
আবুধাবিতে কাটানো প্রথম এক দশক ওয়াহিদ একজন কর্মী হিসেবে কাটিয়েছেন, ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং ধাপে ধাপে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন।
ব্যবসায় তাড়াহুড়ো করে নেমে পড়ার বদলে তিনি কর্মক্ষেত্রের চাহিদা বোঝা, মানুষের বিশ্বাস অর্জন এবং নিজের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর মনোযোগ দিয়েছিলেন। ইলেকট্রিশিয়ান থেকে ডিপার্টমেন্ট ইনচার্জ পদে উত্তরণ তাকে এমন কিছু অভিজ্ঞতা দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে নিজের ব্যবসা শুরু করার সময় কাজে লেগেছিল।
ওয়াহিদ আরও বলেন, ‘আমার কাছে তখন কোনো মূলধন, বড় যোগাযোগ বা পদবী ছিল না। আমার সম্বল ছিল একটি টুলবক্স আর কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা।’
নতুন করে শুরু করার চ্যালেঞ্জগুলো
আবুধাবিতে কাটানো প্রথম বছরগুলোতে আর্থিক চাপ বেশ কঠিন ছিল বলে উল্লেখ করেন ওয়াহিদ। তবে কঠোর শৃঙ্খলা, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ এবং বিশ্বাসের জোরে তিনি সেই দিনগুলো পার করে এসেছেন।
ওয়াহিদ জানান, প্রথম দিনগুলো খুব কঠিন ছিল। আমার বেতন ছিল খুব কম, তাই প্রতিটি দিরহাম হিসাব করে খরচ করতে হতো। পরিবার থেকে দূরে থাকায় ঘরকে খুব মনে পড়ত। এছাড়া নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি এবং একটি চাহিদাপূর্ণ কর্মপরিবেশের সঙ্গে আমাকে মানিয়ে নিতে হয়েছিল।
তিনি খুব সাধারণ জীবন যাপন করেছেন, সাবধানে সঞ্চয় করেছেন এবং নতুন দক্ষতা অর্জন অব্যাহত রেখেছেন। কাজটি যত ছোটই হোক না কেন, তিনি প্রতিটি কাজকেই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
আবুধাবির জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিভিন্ন জাতীয়তার সহকর্মীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কও তাকে সাহায্য করেছিল।
তিনি বলেন, ‘ওই বন্ধুত্বগুলো আমাকে শিখিয়েছে যে, পৃথিবীর সব মানুষেরই আশা-আকাঙ্ক্ষা একই রকম। প্রতিটি কঠিন দিনই সেই ভিত্তির অংশ হয়ে উঠেছে, যার ওপর আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি।’
আবুধাবি হয়ে উঠল তার ঘর
আবুধাবি তাকে এমন একটি পরিবেশ উপহার দিয়েছে যেখানে তিনি নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পেরেছেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে পেরেছেন এজন্য তিনি এই শহরের প্রতি কৃতজ্ঞ।
ওয়াহিদ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘প্রতিটি স্বপ্নদ্রষ্টার যা প্রয়োজন- নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়বিচার, আবুধাবি আমাকে তা দিয়েছে। এখানে পরিশ্রমের মূল্যায়ন করা হয়। এখানকার আইন স্পষ্ট, শহরটি নিরাপদ এবং এর নেতৃত্ব এমন প্রত্যেক মানুষের ভবিষ্যৎ গড়তে বিশ্বাস করে যারা এর উন্নয়নে অবদান রাখে।’
বছরের পর বছর ধরে এই শহরটি কেবল জীবিকা নির্বাহের জায়গা ছাড়িয়ে তার কাছে আরও বেশি কিছু হয়ে উঠেছে। এটি এমন এক জায়গা যেখানে তিনি তার পেশাগত জীবন গড়ে তুলেছেন এবং একে নিজের দ্বিতীয় বাড়ি বানিয়ে নিয়েছেন।
ওয়াহিদ বলেন, ‘আমি আমার ক্যারিয়ার এখানেই গড়েছি, ব্যবসা এখানেই দাঁড় করিয়েছি এবং এখানেই আমার দ্বিতীয় ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। আবুধাবি শুধু আপনাকে স্বপ্ন দেখতে শেখায় না, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্ল্যাটফর্মও তৈরি করে দেয়।’
আত্মদর্শনের প্রিয় জায়গা
রাজধানীতে ওয়াহিদের পছন্দের জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ। এর চমৎকার স্থাপত্যশৈলী তাকে মুগ্ধ করে এবং এই মসজিদে গেলে তিনি এক ধরনের মানসিক শান্তি ও আত্মদর্শনের অনুভূতি পান। ইসলামি সংস্কৃতি, শিল্পকলা এবং শিক্ষার মেলবন্ধন যেভাবে এই মসজিদে ঘটেছে, তা তাকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে।
২০০৫ সালে আবুধাবিতে আসার পর থেকে তিনি কতটা পথ পাড়ি দিয়েছেন, মসজিদটিতে গেলে তা নিয়ে ভাবার সুযোগ পান ওয়াহিদ।
তিনি বলেন, ‘ইসলামি সাংস্কৃতিক সম্পদ এবং সমাজসেবার ওপর এর যে গুরুত্ব, আমি বিশেষভাবে তার প্রশংসা করি। আমার এই যাত্রাপথ নিয়ে একটু শান্ত মনে ভেবে দেখা এবং আমি যে সুযোগগুলো পেয়েছি তার জন্য কৃতজ্ঞতা বোধ করা এই বিষয়গুলো জায়গাটিকে আমার কাছে বিশেষ করে তুলেছে।’
অন্যের জন্য সুযোগ তৈরি করা
ওয়াহিদ বিশ্বাস করেন, ব্যক্তিগত সাফল্যের পরিধি কেবল নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। নিজের ইভেন্টস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে সহায়তা করছেন এবং তরুণ ও সহকর্মী প্রবাসীদের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্বল্প আয়ের কর্মী হিসেবে তার নিজের অতীতের সংগ্রামের দিনগুলো তাকে ক্যারিয়ারের শুরুতে থাকা মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সীমিত সম্পদ নিয়ে জীবন শুরু করার চ্যালেঞ্জগুলো তিনি নিজে খুব ভালোভাবেই বোঝেন, তাই অন্যদেরও নিজেদের অবস্থার উন্নতির সুযোগ করে দিতে চান তিনি।
ওয়াহিদ বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, অন্য মানুষের জীবনকে ওপরে তোলার সুযোগ তৈরি না করতে পারলে সেই সাফল্যের কোনো অর্থই থাকে না। আবুধাবি আমাকে একটি সুযোগ দিয়েছিল, আর সেই সুযোগ আমি অন্যদের হাতেও পৌঁছে দিতে চাই।’
নতুনদের প্রতি পরামর্শ
আবুধাবিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে ইচ্ছুক নতুন প্রবাসীদের প্রতি ওয়াহিদের পরামর্শ হলো ধৈর্য ধরতে হবে এবং ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিতে হবে।
তিনি নতুনদের পরামর্শ দিয়েছেন, শুরুতে কম বেতন দেখে হতাশ না হয়ে নিজেদের দক্ষতায় বিনিয়োগ করতে, ভাষা শেখার ওপর জোর দিতে এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে।
এ ছাড়া তিনি প্রথম থেকেই সঞ্চয় করা, সামর্থ্যের মধ্যে জীবনযাপন করা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও আইনকে সম্মান করার তাগিদ দিয়েছেন। সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি বর্তমান পরিস্থিতি দেখে দমে না গিয়ে আরও দূরের লক্ষ্য রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
ওয়াহিদ বলেন, ‘এখানে সাফল্য ধাপে ধাপে অর্জিত হয়। আপনার প্রথম বেতনই আপনার শেষ গন্তব্য নয়। আপনি কোথা থেকে শুরু করলেন তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না যে আপনি কোথায় গিয়ে শেষ করবেন। কৃতজ্ঞ হোন। যে কেউ সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত, আবুধাবি তাকে প্রকৃত সুযোগের সন্ধান দেয়।’ সূত্র: গালফ নিউজ
তামান্না রুপা/
