রিফাতের বয়স ৯ বছর। সে কড়া রোদে হাঁটতে হাঁটতে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায়। এক হাতে তার একটা ছোট্ট ক্যানভাস ব্যাগ, তাতে একটা খাতাপত্র, কিছু পেনসিল, আর একটা খেলনা ট্রেন। অন্য হাতে ধরা রংচঙে ছাতা। কিন্তু ছাতাটা খোলা না, কারণ রিফাত রোদের ভয় পায় না। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখে, লাল রঙের লোকাল ট্রেনটা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চলে যাচ্ছে। তার কান তাকিয়ে থাকে প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে ঝুলে থাকা পুরোনো ঘণ্টার দিকে।
প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় ঘণ্টাটা বাজে। বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে। তবে সেটার শব্দ আলাদা। ধাতব নয়, বরং যেন কাচের মতো স্বচ্ছ একটা আওয়াজ–চ্রিং... চ্রিং… চ্রিং…। রিফাত ভাবে, এই ঘণ্টার আওয়াজ কেন এমন? কেন বিকেল ৪টা ৫ মিনিটেই বাজে? সকাল নয়, দুপুর নয় ঠিক এ সময়েই কেন?
রিফাতের মা স্টেশনের ক্যান্টিনে কাজ করেন। একপাশে চায়ের বয়, অন্য পাশে মোটা গলায় কথা বলা মাসুদ কাকা, আর মাঝে রিফাতের মা। চোখে চশমা, মুখে ক্লান্তি। কাজ শেষ হলে রিফাত তাকে নিয়ে বাসায় ফেরে। কিন্তু রিফাতের মন পড়ে থাকে ঘণ্টার কাছে। প্রতিদিন।
এক দিন, বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে রিফাত অদ্ভুত কিছু দেখল। ট্রেন থেমেছে ঠিকমতো। মানুষ উঠছে-নামছে। হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে, আনুমানিক সাত-আট বছরের। নীল শার্ট পরে, খালি পায়ে, চুল এলোমেলো। প্ল্যাটফর্মের একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সে তাকিয়ে আছে ঘণ্টার দিকে। তার পেছনে কেউ নেই। সামনে কেউ নেই। কেউ যেন তাকে দেখতে পাচ্ছে না। শুধু রিফাতই তাকিয়ে আছে তার দিকে। ছেলেটা ধীরে ধীরে ঘণ্টার নিচে গিয়ে দাঁড়াল, আর এক ঝটকায় মিলিয়ে গেল বাতাসে। রিফাত চিৎকার করতে গেল, কিন্তু কেউ শুনল না।
পরের দিন থেকে রিফাত নতুন একটি কাজ শুরু করল। সে ঘণ্টা বাজার সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানে, কিছু একটা আছে এই ঘণ্টার মধ্যে। কিছু একটা হারিয়ে যাওয়ার গল্প।
সে তার খাতায় নোট নিতে শুরু করল, ‘আজ ৪টা ৫। ট্রেন থামল। সেই ছেলেটা আবার এসেছে। একই রকম মুখ, খালি পা, নীল জামা। কেউ তাকাচ্ছে না। কেউ দেখছে না। সে ঘণ্টার নিচে গিয়ে দাঁড়াল, আমাকে দেখল না। কিন্তু আজ তার মুখে হাসি ছিল। খুব মায়াবী সে হাসি।’
রিফাত ভাবল, সে একা নয়। কেউ না কেউ জানে এই ছেলেটা কে। স্টেশন মাস্টারকে জিজ্ঞেস করল, কাকা, আমাদের ঘণ্টা কি অনেক পুরোনো?
স্টেশন মাস্টার চোখ কুঁচকে তাকালেন, হ্যাঁ রে। এই ঘণ্টা এখানে আছে প্রায় ৩০ বছর ধরে। বল তো, কৌতূহলটা কীসের?
আপনি কি জানেন, ঘণ্টা বাজার সময় একজন বাচ্চা আসে এখানে?
মাস্টার হেসে বললেন, তুই স্বপ্ন দেখিস তাই না?
রিফাত কিছু বলল না। পরের শুক্রবার, রিফাত ক্যান্টিনের বুথ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ঘণ্টার নিচে দাঁড়াল। ৪টা ৫ বাজতেই আবার সেই ছেলেটা এল। এবার সে সরাসরি রিফাতের চোখে তাকাল। চোখ দুটি পানিতে টলমল করছে, কিন্তু মুখে মিষ্টি হাসি।
তুমি আমাকে দেখতে পারো?
রিফাত ধীরে মাথা নাড়ে।
তুমি কি জানো, আমি কোথায় গেছি?
না... কিন্তু আমি খুঁজতে চাই।
ছেলেটা তখন বলল, আমার নাম রাহাত। আমি হারিয়ে গেছি ১৩ বছর আগে। এই স্টেশন থেকে। আমি মাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম, ট্রেন চলছিল, আমি একা ছিলাম। তারপর… কিছু মনে নেই। শুধু এই ঘণ্টার আওয়াজ মনে পড়ে। আমি এখানেই রয়ে গেছি।
রিফাতের চোখে জল চলে এল।
তোমার মা... এখন কোথায়?
জানি না। খুঁজে দাও না আমাকে?
রিফাতের মাথায় তখন শুধু একটাই লক্ষ্য, রাহাতকে তার মায়ের কাছে ফেরত পাঠানো। সে মায়ের কাছে গিয়ে সব বলে। মা প্রথমে হেসে উড়িয়ে দেয়, কিন্তু রিফাতের গম্ভীর চোখ দেখে থেমে যায়। বলল, একটা কাজ কর। স্টেশনের পুরোনো রেকর্ড খাতাগুলো দেখ। যদি রাহাত নামের কারও নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট থাকে।
রিফাত কাগজপত্র ঘেঁটে এক দিন পেয়ে গেল, ‘২০১১ সালের ১৭ মার্চ, বিকেল ৪টা ৫ মিনিট। ৮ বছর বয়সী রাহাত নিখোঁজ। নীল জামা পরিহিত, প্ল্যাটফর্ম নম্বর ২, ঢাকার একটি লোকাল ট্রেন।’
রিফাত চোখের পানি ফেলল। ঠিক সেই সময়, সেই জায়গা! পরদিন বিকেল। রিফাত আবার দাঁড়িয়ে গেল ঘণ্টার নিচে। ঘণ্টা বাজল, ছেলেটা এল, এবার তার চোখে জল। রিফাত বলল, তোমার মাকে খুঁজে পেয়েছি। এখন তুমি যেতে পারো।
রাহাত হাসল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ধন্যবাদ রিফাত। তুমি আমার বন্ধু ছিলে। বিদায়।
সে মিলিয়ে গেল। আর কোনো দিন বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে সেই ছেলেটা এল না। ঘণ্টার আওয়াজটাও বদলে গেল। এখন আর সেটা কাচের মতো স্বচ্ছ নয়। ধাতব, শক্ত, বাস্তব। রিফাত জানে, একটি আত্মা মুক্তি পেয়েছে। এক বন্ধু তার মাকে ফিরে পেয়েছে। আর রেলস্টেশনের সেই পুরোনো ঘণ্টা? সে এখন রিফাতকে দেখে একটু ঝুঁকে পড়ে, যেন একটা নিঃশব্দ ধন্যবাদ জানায়।
