প্রকৃতি-সংস্কৃতির মেলবন্ধনে কুয়াকাটায় ফিরছে পর্যটন কার্নিভ্যাল। আজ শুক্রবার ও আগামীকাল শনিবার দুই দিনব্যাপী এ উৎসব ঘিরে কুয়াকাটা প্রস্তুত হয়েছে বর্ণিল আয়োজনে। এই সাগরকন্যাকে নতুন করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে দীর্ঘ ৯ বছর পর আয়োজন করা হচ্ছে ‘কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভ্যাল-২০২৬’। সমুদ্রসৈকতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সংগীত, ফ্যাশন শো, কমেডি অনুষ্ঠান, ঘুড়ি উৎসব, পিঠা উৎসব, বিচ ম্যারাথন ও চর বিজয় ভ্রমণ। সবকিছু মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য সাজানো হচ্ছে ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। উৎসবের পরদিন ২৫ অক্টোবর থাকছে ‘ক্লিন কুয়াকাটা’ কর্মসূচি। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন আয়োজিত এ উৎসবে
দেশের নামিদামি তারকা নায়ক-নায়িকা, শিল্পী, ফ্যাশন ডিজাইনার, অভিনেতা এবং ফুটবল ও ক্রিকেট খেলয়াড়রা অংশ নেবেন। এ দুই দিনে কুয়াকাটায় অন্তত ৩ থেকে ৪ লাখ পর্যটক আগমনের আশা করছেন পর্যটন-সংশ্লিটরা।
সরেজমিনে জানা যায়, এ উৎসবকে আরও রাঙিয়ে তুলতে কুয়াকাটায় হোটেল ভাড়ায় ৫০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংগঠনটির সভাপতি মোতালেব শরিফ। এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ জরুরি নোটিশ দিয়েছে সংগঠনটি। কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইদ হাসান স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে চারটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংগঠনটির নির্দেশনাগুলো হলো— ২৩ ও ২৪ অক্টোবর কুয়াকাটার সব হোটেল ও মোটেলে রুম ভাড়ার ওপর বাধ্যতামূলকভাবে ৫০ শতাংশ ছাড় দিতে হবে, প্রতিটি হোটেলে রিসেপশন বা অভ্যর্থনা কাউন্টারে এবং গেস্টদের সহজে দৃষ্টিগোচর হয় এমন স্থানে স্পষ্টভাবে ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্টকৃত ভাড়ার তালিকা টাঙিয়ে দিতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত বা তালিকাবহির্ভূত কোনো অতিরিক্ত অর্থ পর্যটকদের কাছে থেকে আদায় করা যাবে না, কার্নিভাল চলাকালে ও এর পূর্ববর্তী সময়ে প্রতিটি হোটেল, মোটেল ও এর আশপাশের পরিবেশ অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে ও ইভেন্টটিকে উৎসবমুখর করে তুলতে প্রতিটি হোটেল ও মোটেলের প্রাঙ্গণ, মূল ফটক এবং সম্মুখভাগ নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজাতে হবে এবং আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করতে হবে।
উৎসবব উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার আগের দিনই কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা গেছে। কেউ সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করছেন, কেউ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছেন। আবার অনেকে সৈকতের বালুকাবেলায় ঘুরে উপভোগ করছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য। ছুটির আমেজ ও কার্নিভাল ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও বাড়তি আয়ের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। আবাসিক হোটেল-মোটেলগুলোতে পর্যটকদের উপস্থিতি থাকলেও বুকিংয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্রের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। কোনো কোনো হোটেলে কয়েক দিনের জন্য শতভাগ কক্ষ বুকিং রয়েছে, আবার কোনো দিন বুকিং তুলনামূলক কম।
প্রেসিডেন্ট পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক এমজি মোর্শেদ খান বলেন, তাদের রিসোর্টে মোট ৪৩টি কক্ষ রয়েছে। আগামী ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সব কক্ষের শতভাগ বুকিং হয়েছে।
অন্যদিকে, হোটেল ডি’মোরের পরিচালক জয়নুল আবেদিন জুয়েল বলেন, তাদের হোটেলে মোট ৫৭টি কক্ষ রয়েছে। ২১ ও ২২ অক্টোবর সব কক্ষ বুকিং থাকলেও ২৩ অক্টোবর বুকিং রয়েছে ৫০ শতাংশ। তবে ২৪ অক্টোবর কোনো বুকিং নেই।
পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য; বিশেষ করে রাখাইনপল্লী মার্কেটসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা।
কুয়াকাটা রাখাইনপল্লী মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মনির পহলান বলেন, কুয়াকাটায় তিন হাজারের বেশি দোকানপাট রয়েছে। বর্তমানে সব ব্যবসায়ী ব্যস্ত সময় পার করছেন। পর্যটন কার্নিভাল ও ছুটিকে কেন্দ্র করে কেনাকাটা, খাবার এবং বিভিন্ন পর্যটনসেবার চাহিদা বেড়েছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন বলে আশা করছেন তিনি।
কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণ একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ, বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা এবং সমুদ্রের মনোরম দৃশ্য। উৎসবের ছুটির সঙ্গে কার্নিভালের আমেজ যুক্ত হওয়ায় পর্যটকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটায় তিন শতাধিক আবাসিক হোটেল-মোটেল রয়েছে। এসব হোটেল-মোটেলে ধারণক্ষমতা রয়েছে প্রায় ৪০ হাজার পর্যটকের। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান বলেন, পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে কুয়াকাটা ভ্রমণ করতে পারেন, সে জন্য নিরাপত্তা ও নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, পর্যটকেরা যাতে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে কুয়াকাটা ভ্রমণ করতে পারেন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পর্যটকদের সেবার মান বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। পর্যটন কার্নিভালকে ঘিরে কুয়াকাটায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সৈকতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পর্যটনসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
