ভোটার তালিকা হালনাগাদের এসআইআর কার্যক্রমসহ নানা ইস্যুতে বিরোধীদের প্রতিবাদের মুখে বিরোধী দল কংগ্রেসের কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার তিনি অভিযোগ করেছেন, কংগ্রেস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে, সংসদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং অন্যান্য বিরোধী নেতাদের কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে।
একটি গণমাধ্যম সামিটে বক্তব্য রাখার সময় মোদি বলেন, বিশ্ব যখন এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও কাঠামোর খোঁজে রয়েছে, তখন কিছু মানুষ ভারতে বিশৃঙ্খলা তৈরির স্বপ্ন দেখছে।
বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য বিরোধী নেতাদের অভিযুক্ত করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে যেখানে তীব্র অস্থিরতা চলছে, সেখানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি শক্তিশালী ভারতের চিত্র তুলে ধরা উচিত ছিল। অথচ এই ব্যক্তিরা যেন ভারতের সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই উঠেপড়ে লেগেছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর প্রতি ইঙ্গিত করে নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, তারা বিদেশে গিয়ে ভারতের বদনাম করে এবং এতে হস্তক্ষেপ করার জন্য বিদেশিদের কাছে আকুতি জানায়।
দলীয় নেতাকে বারবার প্রমোট বা সামনে আনার চেষ্টার সমালোচনা করে কংগ্রেসকে খোঁচা দেন মোদি। সরাসরি রাহুলের নাম না নিয়ে তিনি বলেন, ভাবতে অবাক লাগে, নিজেদের এই ‘ব্যর্থ পণ্যকে’ বারবার চালুর চেষ্টা চালাতে গিয়ে কংগ্রেস আর কত দিন দেশকে ঝুঁকিতে ফেলবে?
মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র শ্রীহরিকোটার প্রসঙ্গ টেনে মোদি ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলেন, আমাদের শ্রীহরিকোটা স্পেস সেন্টার থেকে বছরে যতগুলো কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়, তার চেয়েও বেশি বার কংগ্রেস তাদের নেতাকে পুনরুত্থানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।
কংগ্রেসের তাদের নিজেদের পতন ডেকে আনা নিয়ে তার কোনো আপত্তি নেই উল্লেখ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের পরিবারকে ক্রমাগত ব্যর্থতার দায় থেকে বাঁচাতে এখন ভারতের সাফল্য নিয়েই প্রশ্ন তুলছে দলটির নেতারা।
মোদি বলেন, এ নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে নিজেদের পরিবারকে একের পর এক ব্যর্থতার কলঙ্ক থেকে রক্ষা করার মরিয়া চেষ্টায় কংগ্রেস এখন ভারতের সাফল্য, অর্জন এবং অগ্রযাত্রাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে তিনি আরও বলেন, ‘তাদের অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে, আঙুর ফল টক ভেবে তারা মূল লতাটিই কেটে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।’
গান্ধী পরিবারকে কংগ্রেসের জন্য একপ্রকার ‘বোঝা’ হিসেবে বর্ণনা করেন মোদি। তিনি দাবি করেন, কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতারা ব্যক্তিগত আলাপে বিষয়টি স্বীকার করলেও প্রকাশ্যে তারা নীরব থাকেন।
তিনি বলেন, সত্যি বলতে, এই পরিবারটি এখন কংগ্রেসের জন্য এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে; যা দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারাও হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন। ব্যক্তিগত আলাপে তারা এ কথা আমাদের কাছে স্বীকারও করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা নীরব থাকার পথই বেছে নেন।
কংগ্রেসের এই ধরনের আচরণের কারণে যেসব বিরোধী নেতা গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের সমালোচনা করতে চান, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কংগ্রেসের এমন মনোভাব সরকারের সৎ সমালোচকদেরও ক্ষতি করছে, যা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য এক বড় মাশুল। যারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকারের বিরোধিতা প্রকাশ করতে চান, কংগ্রেসের কারণে তাদের আওয়াজ হারিয়ে যায়; এসব নীতিবান সমালোচকের কণ্ঠ এভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদি আরও যোগ করেন, এমনকি যারা দেশের সার্বিক কল্যাণ ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে চান এবং সরকারের কট্টর বিরোধী, কংগ্রেসের অব্যাহত হট্টগোল ও হইচইয়ের মাঝে তারাও নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার মতো কোনো জায়গা পাচ্ছেন না।
কংগ্রেস কেবল একজন ব্যক্তিকে খবরের শিরোনামে বা আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে গিয়ে সংসদের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করছে এবং অন্যান্য বিরোধী এমপিদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে বলেও অভিযোগ করেন মোদি।
তিনি বলেন, আমরা সংসদে দেখেছি যে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে অনেক প্রভাবশালী ও মেধাবী তরুণ সদস্য আছেন, যারা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে চান এবং নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে চান। কিন্তু কংগ্রেস কেবল একটি নির্দিষ্ট মুখকে আলোচনায় রাখতে চায় বলে পুরো সংসদের কার্যক্রম অচল করে দেয়, যাতে অন্য কেউ কথা বলার সুযোগ না পান। এর মাধ্যমে কংগ্রেস ওই তরুণ বিরোধী এমপিদের প্রতি চরম অন্যায় করছে।
সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা কিংবা ব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলোকে কংগ্রেস নস্যাৎ করে দিচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মোদি আরও যোগ করেন, গণতন্ত্রের স্বার্থেই সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি সামনে আনা কিংবা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলো অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু কংগ্রেসের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সে ধরনের সুসংহত উদ্যোগগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কংগ্রেসকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে নরেন্দ্র মোদি দলটিকে ‘পরজীবী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দাবি করেন, এটি এখন ‘নগর নকশালদের’ প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন
তিনি বলেন, ‘কংগ্রেস এখন একটি ‘পরজীবী’ দলে পরিণত হয়েছে, যা অন্য কাউকে এগোতে দিতে চায় না। দলটি পুরোপুরি ‘আর্বান নকশালদের’ (নগর নকশাল বা ভাবাদর্শিক নকশাল) নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, যার ফলে এদের নিজস্ব চিন্তা করার সক্ষমতাও হারিয়ে গেছে। একসময় যারা আমাদের বনে-জঙ্গলে তান্ডব চালাত, তারা এখন কংগ্রেসে অনুপ্রবেশ করেছে এবং দেশকে ধ্বংস করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, এতসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আমরা আমাদের সামনে একটি ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার মহৎ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। আমাদের জাতির আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন। আজ সমগ্র ভারতে একই সুর ধ্বনিত হচ্ছে— ‘আমরাই করব, আমরাই করে দেখাব’। আমরা বড় স্বপ্ন দেখব, প্রতিটি প্রতিকূলতাকে সুযোগে রূপান্তর করব এবং আমাদের প্রতিটি সংকল্পকে সফল পরিণতিতে পৌঁছে দেব।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের আত্মবিশ্বাসই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, আর আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে ১৪০ কোটি নাগরিকের স্বপ্ন। আমরা নতুন নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করব, নতুন পথ তৈরি করব, নতুন উচ্চতায় পৌঁছাব এবং ভারতের সাফল্যকে বৈশ্বিক সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করব।
সূত্র : দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
এনএফ
