বাংলাদেশ তরুণদের বিক্ষোভের উদ্ভাবক নয়। কিন্তু আধুনিক Scriptটি বাংলাদেশই লিখেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চাকরির কোটা নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা একটি সংকীর্ণ অভিযোগকে জাতীয় বিদ্রোহে পরিণত করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এর পর থেকে কাঠমান্ডু থেকে সোফিয়া পর্যন্ত তরুণরা ভিন্ন ভিন্নরূপে একই নাটক মঞ্চস্থ করার চেষ্টা করেছে। কেউ কেউ জয়ী হয়েছে। আবার কেউ কেউ শিখেছে যে, একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সহজ অংশ মাত্র।
ঢাকা মডেলের স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য ছিল। এর নেতৃত্ব দিয়েছিল শিক্ষার্থীরা, কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটি ছিল বিকেন্দ্রীকৃত- এমন সমন্বয়কদের দ্বারা পরিচালিত, যাদের গ্রেপ্তার করা গেলেও প্রতিস্থাপন করা সম্ভব ছিল। এটি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে দখলকৃত গণমাধ্যমকে পরাজিত করেছিল এবং ইন্টারনেট বন্ধের মুখেও টিকে ছিল। এর জন্য ভয়াবহ মূল্যও দিতে হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১,৪০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হতে পারে। তাদের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত ছিল শিশু। প্রতিবেদনে বলা হয়, সহিংসতা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। এ পরিমাণ ত্যাগ আন্দোলনকে নৈতিক শক্তি দিয়েছিল। একই সঙ্গে এটি উভয় পক্ষের জন্যই পিছু হটাকে অসম্ভব করে তুলেছিল।
ফলাফল বাস্তব। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস একটি অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেন। সংস্কার কমিশনগুলো জুলাই সনদ প্রণয়ন করে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ একই দিনে সাধারণ নির্বাচন এবং সেই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠান করে। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ৬৮টি আসন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি জয়লাভ করে মাত্র ছয়টি আসন। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, সনদটি ৪,৭২,২৫,৯৮০ ভোট বা বৈধ ভোটের ৬৮.২৬ শতাংশ দ্বারা অনুমোদিত হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। কিন্তু হিসাবের খাতা মিশ্র। যে শিক্ষার্থীরা অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা তার উত্তরাধিকার পায়নি। পেয়েছে একটি প্রতিষ্ঠিত বংশগত দল। নতুন সরকার গণভোটে পরিকল্পিত সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ আহ্বান করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বিরোধীরা এটিকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়ে জনতার সহিংসতা বেড়ে যায়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, শুধু ২০২৫ সালেই ১৯৭টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘুরা বারবার হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল হাসিনার বিচারকে ‘বিচারের গুরুতর ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেছে। আওয়ামী লীগকে ভোট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর কোনোটিই জুলাই ২০২৪-কে বাতিল করে না। তবে এটি সেই মিথকে প্রশমিত করা উচিত। আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর বেশ কয়েকজন নেতা দ্রুত ক্ষমতার পদে আসীন হন এবং অভিযোগও আসে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, নেপালের বিক্ষোভকারীরা ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা এবং ২০২৪ সালের বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধের ঘটনা ‘নেপো কিডস’দের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। সেখানে ৭৬ জন নিহত হয়। সংসদে অগ্নিসংযোগ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। বিক্ষোভকারীরা ডিসকর্ডে ভোট দিয়ে একটি অন্তর্বর্তী নেতা নির্বাচনে সহায়তা করে। ২০২৬ সালের মার্চে ৩৫ বছর বয়সী সাবেক র্যাপার বালেন শাহ তার দলকে ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টিতে জয়ী করেন। মাদাগাস্কারের জেনজি জানিয়েছে, তারা নেপাল থেকে অনুপ্রাণিত। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দেশটির প্রেসিডেন্ট পালিয়ে যান, কিন্তু ক্ষমতা দখল করেন এক সেনা কর্নেল। একই মাসে পেরুর কংগ্রেস তরুণদের বিক্ষোভের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করে। মরক্কোর জেনজি ২১২ ডিসকর্ডে সংগঠিত হয়। ওয়ান পিসের জলদস্যু পতাকা জাকার্তা থেকে আন্তানানারিভো পর্যন্ত এক অভিন্ন প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ভারত এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেন। পরে তিনি বলেন, তার বক্তব্য শুধু জাল সনদধারীদের সম্পর্কে ছিল। অনলাইনে জন্ম নেয় একটি ব্যঙ্গধর্মী ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ১৬ মে দলটি আত্মপ্রকাশের চার দিন পর এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ফলোয়ার দাঁড়ায় ১ কোটি ৯ লাখে, যা বিজেপির ৮৭ লাখকে ছাড়িয়ে যায়- দ্য ট্রিবিউনের তথ্য অনুযায়ী; অক্টোবরের শুরুতে তা দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখে। ফাঁস হওয়া মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দলটিকে একটি লক্ষ্য এনে দেয়। জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন- ২০১৪ সালের পর নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভা থেকে এমন প্রথম প্রস্থান। এরপর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ পর্যন্ত। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সরকারও নিজের শিক্ষা নিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে সরকার যুক্তি দেয়, লাদাখের কর্মী সোনাম ওয়াংচুক ‘নেপালসদৃশ’ বা ‘বাংলাদেশসদৃশ’ পরিস্থিতি চাইছিলেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে লেহ-তে পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হয়। বাংলাদেশ এখন একই সঙ্গে অনুপ্রেরণা এবং অভিযোগের প্রমাণস্বরূপ প্রদর্শনী হয়ে উঠেছে।
ইউরোপেও একই শক্তি ভিন্ন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। বুলগেরিয়ায় ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষদিকে করভার্ধক বাজেট ঘিরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১১ ডিসেম্বর সরকার পদত্যাগ করে। ভাষ্যকাররা এটিকে জেনজির হাতে ক্ষমতাচ্যুত প্রথম ইউরোপীয় সরকার বলে অভিহিত করেন। সার্বিয়ায় নোভি সাদে একটি স্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর প্রায় দুই বছর ধরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এখন ‘স্টুডেন্টস উইন’ তালিকার ব্যানারে ২৫ অক্টোবরের আগাম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ফ্রান্সের ‘ব্লকোঁ তু’ শুরু হয়েছিল দেশকে অচল করে দেওয়ার এক নেতৃত্বহীন অনলাইন আহ্বান হিসেবে। সেখানেও ওয়ান পিসের পতাকা দেখা গেছে। তবু এই বিস্তারকে অতিরঞ্জিত করা সহজ। সার্বিয়ার বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বরে, নেপালের প্রায় এক বছর আগে। বুলগেরিয়ার ক্ষোভের উৎস তার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখল। ইউরোপীয় বিক্ষোভকারীদের খুব কমই ঢাকার কথা উল্লেখ করেন। তারা কৌশলের চেয়ে নান্দনিকতা বেশি ধার করেন। কাঠামোগত পার্থক্যও রয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও মাদাগাস্কারে ক্ষমতা একটি রাজধানীতেই কেন্দ্রীভূত ছিল, এবং শেষ পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা বাহিনী শাসককে রক্ষা করা বন্ধ করে দেয়। ভারত ফেডারেল রাষ্ট্র- ক্ষমতা বহু শহরে বিস্তৃত এবং সংসদে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর রয়েছে আদালত, নিয়মিত নির্বাচন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সেখানে বাস্তবসম্মত পথ ballot box বা ব্যালট বাক্সের মধ্য দিয়ে যায়। সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরা এটি বোঝে। বুলগেরিয়া ঝুঁকিটি দেখায় : ২০২৬ সালের এপ্রিলের নির্বাচনে জয়ী হন সাবেক প্রেসিডেন্ট রুমেন রাদেভ, বিক্ষোভের প্রজন্ম নন।
তাহলে আসলে কী ছড়িয়ে পড়ে? তিনটি বিষয়। প্রথমত, তরুণদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ। আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী ভারতীয়দের মধ্যে স্নাতক বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। মরক্কোর পরিকল্পনাবিষয়ক হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৩৭.৭ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, সব ফোনে সম্প্রচারিত দৃশ্যমান অভিজাত সুবিধা। তৃতীয়ত, মর্যাদায় আঘাত করা একটি ট্রিগার- কোটা, নিষেধাজ্ঞা, কটূক্তি বা ফাঁস হওয়া পরীক্ষার প্রশ্ন। কৌশল বা টুলসও ছড়িয়ে পড়ে। ডিসকর্ড, ইনস্টাগ্রাম ও মিম সংগঠিত হওয়ার ব্যয় কমিয়ে দেয়। কিন্তু কৌশল ফলাফল নির্ধারণ করে না। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ব্লগে লিখতে গিয়ে ডানকান গ্রিন যুক্তি দেন, আন্দোলন সফল হয় যখন সরকার বিভক্ত বা দুর্বল থাকে- যেমন বাংলাদেশ, নেপাল ও মাদাগাস্কারে; আর ব্যর্থ হয় যখন নিরাপত্তা খাত ঐক্যবদ্ধ ও দমনমূলক থাকে- যেমন ইরান ও মরক্কোতে।
সরকারগুলোর উচিত সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করা। দমন কেবল আগুনে ঘি ঢালে, কোনো প্রতিকার নয়। ঢাকার কঠোর দমন-পীড়ন একটি কোটা বিরোধকে বিপ্লবে পরিণত করেছিল। নেপালের সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধও একই ফল দিয়েছিল। ইন্টারনেট বন্ধ কোনো সরকারকেই রক্ষা করেনি। দেরিতে ছাড় দেওয়ার চেয়ে আগে শোনা কম ব্যয়বহুল।
আন্দোলনগুলোর উচিত আরও কঠিন শিক্ষা গ্রহণ করা। নেতৃত্বহীন বিক্ষোভ রাস্তায় শক্তিশালী, কিন্তু আলোচনার টেবিলে দুর্বল। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অভ্যুত্থান জিতেছে, কিন্তু নির্বাচন জেতেনি। বাংলাদেশ একটি পাইলট, কোনো টেমপ্লেট নয়। এটি প্রমাণ করেছে যে চাকরি বা কণ্ঠস্বরহীন একটি প্রজন্ম একটি শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারে। তবে এমন প্রজন্ম একটি উন্নততর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে- তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। ঢাকার জন্য কাজটি হলো জুলাই সনদকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। ভারত, ইউরোপ ও তার বাইরের জন্য শিক্ষাটি স্পষ্ট। ক্ষোভটি সত্যি। ফলাফল নিশ্চিত নয়। জনতা ঘরে ফেরার পর কী ঘটে, সেটাই নির্ধারণ করবে জুলাই একটি বিপ্লব ছিল, নাকি কেবল একটি ছেদ।
সাইমন মোহসিন : রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশ্লেষক; রিসার্চ ফেলো, বাংলাদেশ নীতি গবেষণা কেন্দ্র
মতামত লেখকের নিজস্ব
