Published on
:
2 min read
দাম্পত্য বা বিবাহিত জীবন বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে দু’টি মানুষের এক হয়ে যাওয়া। সারাদিনের সমস্ত মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া কিংবা সবসময় একে অপরকে সঙ্গ দেওয়ার ছবি। কিন্তু সম্পর্কের সেই নিবিড় বন্ধনের মধ্যেও যদি খানিকটা ফাঁকা জায়গা বা নিজস্ব 'স্পেস' রাখা যায়, তবে কি দাম্পত্য আরও বেশি মধুর হয়ে উঠতে পারে?
প্রাচীন জাপানি জীবনদর্শন ‘মা’ (Ma) কিন্তু ঠিক এই কথাটির উপরই জোর দিচ্ছে। জাপানি ভাষায় ‘মা’ বলতে বোঝায়— একটি পরিকল্পিত বিরতি। দুটি বস্তুর ভিতরের সুনির্দিষ্ট ফাঁকা জায়গা বা ইন্টারভ্যাল। এই দর্শন শেখায়, বিবাহিত জীবন মানেই একে অপরকে আঁকড়ে ধরে থাকা বা দমবন্ধ করা ভালোবাসা নয়। বরং দু'টি আলাদা মানুষের স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য ভালোবাসার ভিতরেই কিছুটা ‘লাইটিং স্পেস’ বা নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা দেওয়া।
‘মা’ বিষয়টা কী?
জাপানি সংস্কৃতিতে ‘মা’ কিন্তু সঙ্গীকে অবহেলা করা, কথা বন্ধ করে দেওয়া বা দূরত্ব তৈরি করা বোঝায় না। বরং এটি পশ্চিমি ভাবধারার ‘দু’জন মিলে এক হয়ে যাওয়া’র ধারণাকে খানিকটা চ্যালেঞ্জ করে। দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমেই এই দর্শন ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। যেমন:
স্বতন্ত্র রুটিন: একজন হয়তো উইকএন্ডে বইয়ের ক্লাসে ব্যস্ত, আর অন্যজন একলা হেঁটে আসতে ভালোবাসেন। এটিকে দূরে সরে যাওয়া না ভেবে, নিজের মনকে 'রিচার্জ' করার মাধ্যম হিসেবে ভাবাই হলো 'মা'।
কথা বলার মাঝে বিরতি: সঙ্গীর সঙ্গে আবেগঘন বা ঝগড়ার মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে একটু নীরবতা বা বিরতি বজায় রাখা।
শারীরিক ও মানসিক স্থান দেওয়া: সঙ্গী যখন রান্না করছেন, বই পড়ছেন বা নিজের ব্যক্তিগত চিন্তায় ডুবে আছেন, তখন তাকে সেই মুহূর্তটিতে একদম বিরক্ত না করা।
কেন দাম্পত্যে নিজস্ব ‘স্পেস’ বা নীরবতা প্রয়োজনীয়?
মনোবিদদের মতে, একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা মানে এই নয় যে আপনাকে আপনার ব্যক্তিগত পরিচিতি বিসর্জন দিতে হবে।
ব্যক্তিত্ব বজায় রাখা: দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে সন্তান, সংসার ও দায়িত্বের ভিড়ে মানুষ অনেকসময় নিজের শখ বা সত্তাকে হারিয়ে ফেলে। নিজস্ব বন্ধু বান্ধব বা শখ বজায় রাখলে সঙ্গীর উপর সমস্ত মানসিক চাহিদার বোঝা তৈরি হয় না।
নিজেকে শান্ত করার সুযোগ: কাজের জায়গায় চরম মানসিক চাপের পর বাড়ি ফিরে কেউ যদি ১০ মিনিট একলা নিস্তব্ধতায় বসতে চান, তবে তার অর্থ এই নয় যে তিনি সঙ্গীকে এড়িয়ে চলছেন। নিজের মনকে শান্ত করার জন্যই সেই নীরবতাটুকু প্রয়োজন।
সুস্থ ‘স্পেস’ বনাম মনের দূরত্ব
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, কখন এই দূরত্ব সম্পর্ককে মজবুত করে আর কখন তা বিচ্ছেদের লক্ষণ হয়ে ওঠে? বিশেষজ্ঞরা দু'টি বিষয়ের মূল তফাত স্পষ্ট করেছেন।
সুস্থ স্পেস: ঝগড়া বা তর্কের সময় আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে যখন কেউ বলতেই পারেন, ‘আমি এখন একটু শান্ত হতে চাই, আমরা পরে কথা বলছি’, এবং পরবর্তীতে ফিরে এসে সমস্যা সমাধান করে, তখন তা অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর।
মনের দূরত্ব বা এড়িয়ে চলা: কিন্তু কেউ যদি কোনও বড় সমস্যা বা নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার বাহানা হিসেবে বারবার ‘আমাকে একলা থাকতে দাও’ বলে কেটে পড়ে এবং পরবর্তীতে সেই বিষয় নিয়ে আর আলোচনা না করে, তবে বুঝতে হবে স্পেসের নামে আসলে সম্পর্কে বড় দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
দাম্পত্যের আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এই ভালোবাসা এবং সম্মানপূর্ণ দূরত্বের ব্যালান্স বা ভারসাম্যের মধ্যেই।