দুর্গাপুজো এলেই কাশফুলের মতো একরাশ শৈশব আমায় ঘিরে ধরে। আমার ছোটবেলা কেটেছে দেশের বাড়ি বাদুড়িয়ার আড়বেলিয়া গ্রামে। সেখানকার পুজো শতবর্ষের চৌকাঠ পেরিয়েছে বহু আগেই। বিশাল চোখ ধাঁধানো পুজোমণ্ডপ। সারা বছর সেখানে অনুষ্ঠান হয়। যাত্রাপালা, নাটক, গানবাজনা সবই চলত। সবচেয়ে বড় কথা, সেই পুজো মণ্ডপের পরিবেশ এতটাই মনোরম ছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বড় বড় আম গাছ, জামরুল, জাম, পেয়ারা ও নারকেল গাছের এক সবুজের স্নিগ্ধতা মনকে যেন আরও বেশি ফুরফুরে করে তুলত।
মেজো জ্যাঠামশাই আমায় খুব ভালবাসতেন। খুবই নিষ্ঠা সহকারে তিনি দুর্গাপুজো করতেন। আলাদা করে অষ্টমীর দিনে আমায় অঞ্জলি দেওয়াতেন। আলাদা করে ফুল-বেলপাতা মায়ের পায়ে ছুড়ে দিয়ে বলতেন, আমার এই ভাইপোটার জগৎ জোড়া নাম হোক। যশ হোক। আয়ুষ্মান হোক। এই পুজো খুবই নিষ্ঠা সহকারে পালন করা হতো। শুধু আমাদের পরিবার বা আত্মীয়স্বজন নয়, গোটা গ্রামের মানুষ অংশ নিতেন এই পুজোয়।
বাবার ছিল বাইরে ঘোরার চাকরি। সবারই ধারণা ছিল তিনি এ বার পুজোয় আসতে পারছেন না। তখন তো আর চিঠি ছাড়া আর কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। কয়েকদিন আগে আসা চিঠিতেও বাবা মন খারাপ করে লিখেছেন যে, কাজের খুব চাপ রয়েছে। গত বছরের পুজোর মতো এ বারেও আমার যাওয়া বড় অনিশ্চিত। মন খারাপ করো না কেউ। তোমরা পুজোয় আনন্দ করো। আর তাই হলো। আমরা কেউই আর বাবাকে এই পুজোয় আশা করিনি।
মায়ের মন যথেষ্ট খারাপ ছিল সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভিটের জাগ্রত দেবতা সেটা বোধহয় উপলব্ধি করেছিলেন। হঠাৎই সপ্তমীর ভোরে বাবা এসে হাজির। গোটা বাড়ি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এই বংশের আর কেউ তা হলে গরহাজির থাকল না। যথারীতি হই-হুল্লোর শুরু হয়ে গেল।
আমাদের এই পুজোয় কুমারীপুজোর প্রচলন ছিল। উফ, সে কী উন্মাদনা। এক বছর আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যেত পরের বছরের কুমারী কে হবে। সেই সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত হতে হবে। এর জন্য প্রত্যেকেরই মতামত নেওয়া হতো। বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই আবাহনের সুর শোনা যেত।
এই ঠাকুরের বিসর্জনও ছিল মনে রাখার মতো। এমনিতেই নিয়মে ছিল, কোনও যানবাহন বা ভ্যান রিকশাতে সেই মূর্তি বিসর্জনে যাবে না। বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হতো শক্ত মাচান। তার উপর চাপানো হতো একচালার সেই মূর্তি। বিশাল শোভাযাত্রায় যাঁরা অংশ নিতেন, তাঁদের কাঁধে চেপেই ছেলেপুলে নিয়ে মা রওনা দিতেন ঘাটের উদ্দেশে। আমাদের ঠাকুর বিসর্জন হতো ইছামতী নদীতে। তখনকার ইছামতী আরও বিশাল ছিল। ভয়ঙ্কর ছিল স্রোত।
আমাদের গ্রাম থেকে ইছামতী নদীর দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। বেশি ছাড়া কম নয়। আমি তখন এতই ছোট, মনের জোরে বেশ কয়েক কিলোমিটার হেঁটেই চলে যেতাম অন্যদের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে। কিন্তু দম বেরিয়ে যেত ফেরার সময়ে। একে তো নতুন জুতোর ফোসকা। অন্যদিকে, হাঁটু ব্যথা। হেঁটে ফেরা দুষ্কর ব্যাপার। ভরসা তখন বাবা। বাবাও বুঝতে পারতেন। কাঁধে চড়িয়ে নিতেন। ওই পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা বাবার কাঁধে চড়েই বাড়ি ফেরা, যা আজও আমার জীবনের এক সেরা উপলব্ধি এবং ভালোলাগা।