বাংলাদেশ রেলওয়েতে ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় নিয়মিত ট্রেন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও ইঞ্জিনের অপেক্ষায় ট্রেন ছাড়তে দেরি হচ্ছে, কোথাও পথে বিকল হচ্ছে ইঞ্জিন, আবার কোথাও বাতিল করতে হচ্ছে ট্রেন। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহনও। এর প্রভাব পড়ছে রেলওয়ের আয়েও।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইঞ্জিন সংকটে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিটারগেজ ট্রেন বাতিল ও বিলম্বের সংখ্যা বেড়েছে। এই তিন মাসে ইঞ্জিনের কারণে ১ হাজার ৯৫৮টি মিটারগেজ ট্রেন বাতিল হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৩৭। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ট্রেন বাতিল বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ।
শুধু ট্রেন বাতিল নয়, ইঞ্জিনের জন্য অপেক্ষায় থাকা ট্রেনের সংখ্যাও বেড়েছে। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ইঞ্জিন পেতে বিলম্বের কারণে ২৬১টি মিটারগেজ ট্রেন দেরিতে চলেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৫৮টি। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ইঞ্জিন সংকটে ট্রেন দেরিতে চলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৫২ শতাংশ। ইঞ্জিন পেতে বিলম্বের মোট সময়ও বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৮ গুণ।
রেলওয়ের ট্রাফিক ট্রান্সপোর্টেশন শাখার অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ ইঞ্জিনের দৈনিক প্রাপ্যতা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। ইঞ্জিনের সংকটে সময়সূচি বজায় রেখে ট্রেন পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন পণ্যবাহী ট্রেনের যাত্রাও বাতিল করতে হচ্ছে।
রেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রতিদিন গড়ে ৭৮ দশমিক ৬৪টি মিটারগেজ ইঞ্জিন পাওয়া যেত। চলতি বছরের একই মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৫৮টিতে। আগস্টে ৭৮ দশমিক ৬৪টির বিপরীতে পাওয়া গেছে ৬৮ দশমিক ৬১টি এবং সেপ্টেম্বরে ৭৭ দশমিক শূন্য ৩টির বিপরীতে ৭০ দশমিক ২৫টি।
ব্রডগেজ ইঞ্জিনের প্রাপ্যতাও কমেছে। গত বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে ৯৪টি করে ব্রডগেজ ইঞ্জিন পাওয়া গেলেও চলতি বছরের একই সময়ে পাওয়া গেছে যথাক্রমে ৮৯, ৯০ ও ৮৯টি।
ঢাকা বিভাগে ট্রেন বাতিল বেশি
ইঞ্জিন সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ঢাকা বিভাগে। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বিভাগে ইঞ্জিনের কারণে ১,১৯৪টি মিটারগেজ ট্রেন বাতিল হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে বাতিল হয়েছিল ১ হাজার ১৫৪টি। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এই বিভাগে ট্রেন বাতিল বেড়েছে ৪০টি; যা প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
চট্টগ্রাম বিভাগেও বেড়েছে ট্রেন বাতিলের সংখ্যা। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে এ বিভাগে ৩৪৩টি মিটারগেজ ট্রেন বাতিল হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে বাতিল হয়েছে ৪৬৬টি।
মাসভিত্তিক হিসাবে, চলতি বছরের জুলাইয়ে সারা দেশে ৬৪০টি, আগস্টে ৬৭৪টি ও সেপ্টেম্বরে ৬৪৪টি মিটারগেজ ট্রেন বাতিল হয়েছে। গত বছরের একই মাসগুলোতে বাতিল হয়েছিল যথাক্রমে ৪৭০, ৪৬৭ ও ৬০০টি।
ট্রেন বাতিলের পাশাপাশি ইঞ্জিনের অপেক্ষায় বিলম্বের ঘটনাও বেড়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে ২৬৬টি, আগস্টে ২৩০টি ও সেপ্টেম্বরে ১৬২টি মিটারগেজ ট্রেন ইঞ্জিনের কারণে বিলম্বে পড়েছে। গত বছরের একই মাসগুলোতে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৬৫, ১২৫ ও ৭১টি।
রেলওয়ের হিসাবে, চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে মিটারগেজ ট্রেনের ইঞ্জিন পেতে বিলম্বের মোট সময় ছিল ৭১৯ দশমিক ৪১ ঘণ্টা। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ২৪৪ দশমিক ৯৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ তিন মাসে ইঞ্জিনের অপেক্ষায় ট্রেন পরিচালনায় বিলম্বের মোট সময় বেড়েছে প্রায় ১৯৪ শতাংশ। পথে বিকল হচ্ছে বেশি ইঞ্জিন।
চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনাও বেড়েছে। রেলওয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগে মিটারগেজ এবং ব্রডগেজ মিলিয়ে ৯২টি ইঞ্জিন বিকল হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪০টিতে। অর্থাৎ এক বছরে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ।
রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং চলন্ত অবস্থায় বিকল হওয়ার ঘটনা একই সঙ্গে রেল পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে। নির্ধারিতসংখ্যক ইঞ্জিনের মধ্যে কিছু ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়লে সচল ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। এতে ট্রেনের সময়সূচি বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে রেলওয়ের জন্য পণ্য পরিবহন আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু ইঞ্জিনের স্বল্পতা এবং ট্রেন বাতিলের কারণে পণ্য পরিবহনের নির্ধারিত সূচি বজায় রাখা কঠিন হলে এ খাতের আয় বাড়ানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ইঞ্জিন সংকট মোকাবিলায় কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন আজকের পত্রিকাকে বলেন, লোকোমোটিভ সংকটের জন্য আগের কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি দায়ী। সময়মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনার উদ্যোগ না নেওয়ায় পুরোনো যন্ত্রাংশ জোড়াতালি দিয়ে ইঞ্জিন সচল রাখতে হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে যন্ত্রাংশ পরিবর্তন না করায় মেরামতের পরও ইঞ্জিন বেশি দিন সচল থাকছে না।
সংকট কাটানোর উদ্যোগের বিষয়ে রেলের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এখন প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে মেরামতের অপেক্ষায় থাকা ইঞ্জিনগুলো সচলের চেষ্টা করছি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় ৬৭ থেকে ৬৯টি লোকোমোটিভ সচল ছিল, এখন তা বেড়ে ৭৮টিতে দাঁড়িয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ১০টি লোকোমোটিভ সচল করার লক্ষ্য রয়েছে। সংকট কাটাতে দুটি প্রকল্পের আওতায় ৬০টি নতুন ইঞ্জিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ইঞ্জিন সংকটের পাশাপাশি প্রকৌশল, সংকেত ও পরিবহন বিভাগেও সমস্যা রয়েছে। সব সমস্যার দায় লোকোমোটিভের ওপর চাপানো হয়।’
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গত এক যুগে রেলের অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ হলেও লোকোমোটিভ, কোচ এবং ওয়াগনের প্রয়োজনীয়তা সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এটি পরিকল্পনার ঘাটতি। পাশাপাশি লোকোমোটিভ কেনার ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কেনা ইঞ্জিনের পুরো সক্ষমতাও কাজে লাগানো যায়নি। এই সংকট দীর্ঘদিনের, তাই দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়।’
