মায়ের সঙ্গে মেয়ে এসেছিলেন। বাবার সঙ্গে ছেলে। স্বামী-স্ত্রীও এসেছিলেন। বন্ধু এসেছিল বন্ধুকে নিয়ে। সবার হাতে ছিল ভারতের জাতীয় পতাকা। সবাই এসেছিলেন মধ্যদিল্লিতে। জনসমাবেশের জন্য ‘নিষিদ্ধ’ এলাকায়। তারা দলে দলে সমবেত হয়েছিলেন সমাবেশ না করার সরকারি নির্দেশনা অমান্য করেই।
যদিও সমাবেশকারীদের বাধা দিতে দিল্লির রাজপথে ছিল পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী। দেশটির জাতীয় পতাকাবাহী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দেখা গেল পুলিশের ধস্তাধস্তি। চললো দেদারসে আটকও।
আটক ব্যক্তিদের অনেকে পুলিশ-ভ্যানের ভেতর থেকে চিৎকার করে প্রশ্ন রাখেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ নিষিদ্ধ হয় কীভাবে?’
ভারতের মুম্বাইয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ চলাকালে পতাকা ওড়াচ্ছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রধান অভিজিৎ দীপকে। ছবি: রয়টার্স
বিক্ষোভ-সমাবেশে অংশগ্রহণকারী অনেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে বলেছেন—দমনপীড়ণ করে সরকার কারও মুখ বন্ধ রাখতে পারবে না। তারা নিজ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘হেনস্তার’ বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
উপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের নিপীড়ন-নির্যাতনের সঙ্গে বিজেপি-সরকারের তুলনাও টেনেছিলেন কেউ কেউ। তাদের ভাষায়: ‘ব্রিটিশ সরকার আমাদের পতাকাকে ভয় পেত। এখন বিজেপি সরকার আমাদের পতাকাকে ভয় পাচ্ছে।’
বিক্ষোভকারীদের অনেকের মুখে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে শোনা গেল।
তাদের মতে, এবারের স্বাধীনতা ‘স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা’ থেকে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে তারা ‘নিরপেক্ষ ব্যক্তি দিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন’ ও ‘বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পাশাপাশি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ দাবি জানান।
এ ছিল গত ১৬ অক্টোবর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কের আশেপাশের একাংশের চিত্র। অন্য একটি অংশে ছিল—বিজেপিপন্থিদের সমাবেশ। সেখানে আওয়াজ উঠেছিল—‘মোদি,’ ‘মোদি’।
মোদি-সমর্থকদের সমাবেশে পুলিশ বাহিনীকে ‘হস্তক্ষেপ’ দেখা যায়নি।
পাঠকরা জানেন যে—সরকারের রক্তচক্ষু, পুলিশের ধরপাকড় ও বিজেপি-সমর্থকদের ‘ঠ্যাঙ্গানো’র ভয়কে জয় করে হাজারো মানুষ প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছেন দিল্লি-মুম্বাই-বেঙ্গালুরু-কলকাতা-লখনৌ-পাটনা-সহ ভারতের বহু ছোট-বড় শহরে। তাদের হাতে জাতীয় পতাকা; মুখে মোদি-শাহ-জ্ঞানেশবিরোধী স্লোগান।
বিজেপি কি ‘ব্রিটিশ’?
ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আরশোলাদের আন্দোলন ‘অহিংস’ হবে বলে শুরু থেকেই বলে আসছিলেন সিজেপি বা আরশোলা-প্রধান অভিজিৎ। তিনি সবসময় সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে ও শৃঙ্খলা মেনে সমাবেশের আহ্বান জানান।
আন্দোলনে যোগ দিতে ইচ্ছুক ছাত্র-জনতার প্রতি অন্য সিজেপি নেতাদের অনুরোধ—তাদের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধির পথ অনুসরণ করা। নিয়ম মেনে সমাবেশ করা। সাধারণ জনগণের অসুবিধা না করে বিক্ষোভ দেখানো।
গত ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত ভারতীয় সাংবাদিক সুব্রত বসুর এক পডকাস্টে অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষক গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন রাখেন—‘সরকার কি মনে করছে, আগামী দিনে যাদের ওপর দেশটা দাঁড়িয়ে থাকবে তাদের আটক করে, জেল-বন্দি করে থামিয়ে দেবে?’
তার বক্তব্য: ‘ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকরা মহাত্মা গান্ধিকে ‘সন্ত্রাসী’ বলতো। (সরকারবিরোধী) আন্দোলন চারা গাছ থেকে মহীরুহ হয়ে উঠেছে। বিজেপি বা নির্বাচন কমিশনকে এখন পিছু হটতে হবে। না হলে আরও চূড়ান্ত দমনপীড়ন করে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হবে। এই মুহূর্তে এর বাইরে আর কোনো পথ দেখতে পাচ্ছি না।’
তিনি মনে করেন, ভারতের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে জোরদার করতে ‘বিদেশি তহবিল’ আসার অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাহলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উচিত সেসব দেশগুলোর সরকারকে ‘তহবিল’ যোগাতে নিষেধ করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, উপনিবেশিক ব্রিটিশরাজ যেমন ভারতীয়দের গণতান্ত্রিক দাবি কঠোরভাবে দমনের চেষ্টা করতো, তেমনি মোদি-রাজত্বে বিজেপি সরকার ভারতের আমজনতার দাবি পুলিশ দিয়ে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
তাদের ভাষ্য: উপনিবেশিক আমলে রাজশক্তি যেভাবে অহিংস পন্থায় আন্দোলনকারী মহাত্মা গান্ধিকেও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিত; ঠিক তেমনি শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশ নেওয়া নিরস্ত্র জনগণ ও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সমাবেশের ডাক দেওয়া আরশোলা নেতাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে গণ্য করছে বিজেপি সরকার।
কারও মতে, বিজেপি সরকার কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও তরুণদের নেতৃত্বহীন জমায়েতকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। তারা তরুণদের ব্যাপকহারে ধরপাকড় করছে, টেনে-হিঁচড়ে গড়িতে তুলছে। কেননা, প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের ধারা সরকারি সংস্থাগুলো বুঝতে পারলেও তরুণদের আন্দোলন কৌশল বুঝতে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।
‘দমনের চেষ্টা করলে গুরুত্ব বাড়ে’
গত ১৬ অক্টোবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সরাসরি সম্প্রচারে দেখা গেল—ঘর থেকে বের হওয়ার খানিক পরেই সিজেপি-প্রধান অভিজিৎ দীপকের গ্রেপ্তার। নিরাপত্তার খাতিরে রাস্তা আটকে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে, বিস্তীর্ণ এলাকা অবরুদ্ধ করে আবারও আন্দোলনস্থলকে ‘দুর্গ’ বানাতে দেখলো দিল্লিবাসী।
বিশ্ববাসী দেখলো গণতান্ত্রিক ভারতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর বিজেপি-সরকারের খড়গহস্ত।
সংগঠনটির সেদিনের ‘তিরঙা ওড়াও’ আন্দোলনকে সরকার আপাতদৃষ্টিতে চেপে ধরলেও, বাস্তবে দেখা গেল সরকার নিজেরাই যেন সেই আন্দোলনকে চারপাশে ছড়িয়ে দিয়েছে। সংখ্যায় অল্প হলেও দূর থেকে আসা কয়েকজন সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
তবে গণমানুষের এমন ‘আইনবহির্ভূত’ আচরণ সরকার সহ্য করেনি। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ জানালেন—‘আইনশৃঙ্খলা’ রক্ষার নামে দিল্লির রাস্তায় চলেছিল নির্বিচার তল্লাশি। সংবাদমাধ্যম জানালো—শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করেছিল পুলিশ। সেদিনও অনেককে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তোলার ঘটনা ঘটেছিল।
দিল্লির পুলিশ বিক্ষোভ-সমাবেশের জন্য সরকার নির্ধারিত স্থান যন্তর মন্তরকে আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল। এবার বন্ধ করলো সেন্ট্রাল পার্ক। কারও কারও মন্তব্য ছিল: মধ্যদিল্লির পথে পথে ব্যারিকেড দিয়ে প্রশাসন নিজেই সৃষ্টি করলো যানজট। বিস্তীর্ণ এলাকা অবরুদ্ধ করে তারা নগরবাসীকে অনেকটাই ‘গৃহবন্দি’ করে রেখেছিল।
ঘটনার পরদিন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবিপি আনন্দের এক প্রতিবেদনে বিজেপির জোট শরিক এনসিপিআইয়ের সংসদ সদস্য অরূপ চক্রবর্তীর মন্তব্য তুলে ধরা হয়। তার মন্তব্য দিয়েই সাজানো হয় শিরোনাম—‘আন্দোলন দমনের চেষ্টা করলে তার গুরুত্ব বাড়ে।’
তার মতে, ছাত্র আন্দোলন দমনের চেষ্টা করলে দাবির স্বপক্ষে তৈরি হয় জনমত।
পশ্চিমবঙ্গে ‘বিতর্কিত ভোটার তালিকা’ দিয়ে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়া তৃণমূল ভেঙে এনসিপিআই-এর জন্ম ও বিজেপি-জোটে যোগদান। বিজেপি-জোটে নতুন যোগ দেওয়া এই নেতার বক্তব্য: ‘এটাকে (আন্দোলন) বাড়িয়ে তো লাভ নেই।’
তিনি মনে করেন, ‘আন্দোলনকে দমন করার জন্য যত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাদের সংখ্যা তত বেড়ে যাবে। তারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। নেতৃত্বে যারা থাকবেন তাদের প্রচার বেড়ে যাবে। গ্রেপ্তারের কারণে তাদের জন-সমর্থন বেড়ে যাবে।’
এমন বাস্তবতায় এই সংসদ সদস্যের এমন বক্তব্যে বিজেপি সরকারের অস্বস্তি বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।
‘মাখি জনতা পাটি’
ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোয় বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার যখন আরশোলাদের ‘উৎপাতে’ বিরক্ত, তখন এই আরশোলাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ‘মাছি’।
‘মাছি বাহিনী’ জানিয়েছে, তারা আরশোলাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। সম্মতি থাকলে তারা যৌথভাবে সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়েও আলোচনা করতে পারে।
এরই মধ্যে ‘তেলাপোকারা মরে না’ দাবি করেছেন সিজেপির অন্যতম নেতা আজিঙ্ক্য শিন্ডে। কথাটির বৈজ্ঞানিক ‘সত্যতা’ থাকলেও রাজনৈতিকভাবে এটি কতটা সত্য তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে দ্বিমত থাকতে পারে।
বিজেপি যখন তেলাপোকায় যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ তখন মোদি-শাহের যন্ত্রণা বাড়াতে তেলাপোকাদের দোসর হচ্ছে ‘মাছি’—এমন মন্তব্য শোনা গেল দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোর কয়েকটি প্রতিবেদনে।
গত ১৫ অক্টোবর ভারতীয় দৈনিক আনন্দবাজার এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলে—‘ডানা মেলছে মাছি!’
এতে জানানো হয়—নতুন আত্মপ্রকাশ করা ‘মাখি (মাছি) জনতা পার্টি’ বা এমজেপি বামনেত্রী নেহা বোরাকে সমর্থনের পাশাপাশি আরশোলাদের দিকে বাড়িয়েছে বন্ধুত্বের হাত।
আরও জানা গেল—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা আরশোলাদের মতো ‘এমজেপি’ ইনস্টাগ্রামের একটি ব্যঙ্গাত্মক পেজ।
আনন্দবাজারে প্রকাশিত এক ছবিতে দেখা গেল—সংগঠনটির পক্ষ থেকে এক পোস্টারে লেখা আছে—‘স্মল ভয়েসেস বিগ চেঞ্জ।’ অপর এক পোস্টারে লেখা আছে—‘ফেয়ার ইলেকশনস আওয়ার রাইট’।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেল—গত ৯ অক্টোবর অর্থাৎ, আরশোলাদের ১০ অক্টোবর ‘যন্তর মন্তর চলো’ বিক্ষোভ-সমাবেশের আগের দিন সুপ্রিম কোর্ট বিজেপি সরকারকে সতর্ক করে বলেছিল—‘মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার নয়।’
অর্থাৎ, আরশোলাদের সমাবেশ আটকে দিতে মোদি-শাহ দিল্লির মেট্রো ও দিল্লিগামী ট্রেনগুলো বন্ধ রাখায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ সরকারকে বলেছিল—‘মেট্রোর মতো পরিষেবা বন্ধ করলে লাখো মানুষ সমস্যায় পড়বে। আমাদের এটা দেখতে হবে। আপনি যথার্থ পদক্ষেপ নিতে পারেন। তার মানে মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার নয়।’
বেঞ্চের এমন মন্তব্যে সমাজমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে জন্ম নেয় ‘মাখি জনতা পার্টি’।
এ কথা সবার জানা যে, চলতি বছরের শুরুর দিকে অন্য এক মামলার শুনানি চলাকালে এই প্রধান বিচারপতি ভারতের বেকার ছেলে-মেয়েদের ‘ককরোচ’ বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
এর পরপরই তথা গত মে মাসে অভিজিৎ দীপকের হাতে সমাজমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র জন্ম হয়।
গত জুনে সেই তেলাপোকাদের আন্দোলনে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিপাকে পড়েছিল ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘মহাশক্তি’ হয়ে উঠা বিজেপি। বিশ্লেষকরা বলছেন—শুধু তাই নয়, গণতান্ত্রিক ভারতে ‘ভগবান’ হয়ে উঠা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিজ দেশের কিশোর-তরুণ-যুবাদের হাতে ‘নাস্তানাবুদ’ হতে হয়েছিল।
এবার সেই তেলাপোকাদের দাবি—ভোটার তালিকাকে ‘বিতর্কিত’ করার অভিযোগে অভিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা। ‘দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে’—বলেও জানানো হচ্ছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে।
আনন্দবাজারের সেই প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়—নব গঠিত এমজেপি ইনস্টাগ্রাম বিবৃতিতে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নেহা বোরা ও আরশোলাদের প্রতি সংহতি জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে অনুসারে, ‘নেহার সাহস ও দৃঢ়তার প্রশংসা করে গণতন্ত্রের জন্য প্রশ্ন তোলা ও জবাবদিহি চাওয়াকে অপরিহার্য বলেও উল্লেখ করেছে ইনস্টাগ্রামের এই পেজটি।
‘নাগরিকদের প্রতি এমজেপির আবেদন, তারা যেন দায়িত্বশীলভাবে এবং আইনের মধ্যে থেকে প্রতিবাদের অধিকার চর্চা করেন।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে—‘গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন কথাবার্তা, দূরত্ব নয়।’
সংগঠনটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, গণতান্ত্রিক অধিকার ও বিক্ষোভ-সমাবেশে জনগণের অংশগ্রহণের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন—বিজেপির ‘উৎপাত’ বাড়াতেই জন্ম নিয়েছে ‘মাছি’। এবার তেলাপোকার পাশাপাশি ‘মাছি’ তাড়াতে হবে বিজেপির প্রধান দুই নেতাকে।
‘নেতা বে-শরম!’
ভারতের রাজপথে যখন পুলিশ বাহিনী দিয়ে বিক্ষোভকারীদের দমনের ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার, তখন তরুণ-যুবারা সমাজমাধ্যমকে বেছে নিচ্ছে ক্ষোভ প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। পুলিশ যখন বিক্ষোভকারীদের রাজপথে দাঁড়াতে দিচ্ছে না, তখন সমাজমাধ্যমে বেশ জেঁকে বসেছে মোদিবিরোধী তরুণরা। নানা ধরনের মিম ও ব্যঙ্গরসাত্মক পোস্ট দিয়ে তারা জনমনে সরকারবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করছেন।
গত ১৫ অক্টোবর বিবিসির ‘হাউ জেন জি আর ফাইটিং টু চেঞ্জ ইন্ডিয়া’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার নিজেদের তরুণ-বান্ধব হিসেবে প্রচার করলেও বাস্তবতা হচ্ছে বিজেপি দেশটির বিশাল সংখ্যক তরুণদের মনের পাঠ পড়তেই পারছে না।
তরুণরা বলছে—শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ-সমাবেশ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাদের প্রশ্ন—শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করা সত্ত্বেও কেন লোকজনদের আটক করা হচ্ছে? বিপরীতে সরকার বলছে—তারা যা করছে তা দেশের শান্তি রক্ষার জন্যই করছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়—গত জুন-জুলাইয়ে আরশোলাদের দাবি-আন্দোলনের ফলে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই সাফল্য দেখে তরুণরা বেশ উজ্জীবিত। এবার সেই তরুণদের দাবি অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগে বাধ্য হলে এর প্রভাব সুদূর প্রসারী হতে পারে।
আরশোলাদের প্রধান নেতা অভিজিৎ দীপকে-কে বিজেপি সরকার ‘সমাজবিরোধী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে।
বিবিসির সেই প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়—ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে আন্দোলনকারী তরুণদের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। বিজেপি সরকার প্রযুক্তির দিক থেকে নিজেদের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেও বাস্তবতা হচ্ছে, প্রযুক্তিপ্রেমী তরুণদের সঙ্গে দলটির সখ্যতা কম।
এমন পরিস্থিতিতে দেখা গেল বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে মোদিবিরোধী মিম-পোস্টারের পাশাপাশি ব্যাঙ্গাত্মক গান ও বক্তব্যে ছড়াছড়ি। তেমনি একটি গান ছিল—‘ম্যারা নেতা বে-শরম’।
গত ১৪ অক্টোবর ইউটিউবে প্রকাশিত সেই গানে ভারতের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইউটিউবে প্রকাশিত অন্যান্য মিম ও গানে নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিকৃতভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি তাকে নিয়ে বেশ রসিকতা করতে দেখা যাচ্ছে। তার পুরোনো বক্তব্যগুলোকে নিয়ে হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। কোনো কোনো ভিডিওতে মোদির ‘অন্ধভক্ত’দেরকেও ‘আক্রমণ’ করা হচ্ছে।
তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে আরশোলাদের আন্দোলনের সময়ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে ব্যাপকহারে মিম-প্যারোডি করা হয়েছিল। এখনো সেই ধারা চলমান দেখা যাচ্ছে।
জ্ঞানেশ কুমার থেকে ‘শাসক বদল’?
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশটিতে যখন বিরোধীদের আন্দোলন চলছে তখন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে কমিশনের ‘কীর্তি’ নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।
গত ১৪ অক্টোবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবিপি আনন্দ এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ভোটগণনার ভিডিও হারিয়ে গিয়েছে? নির্বাচন কমিশনকে ভর্ৎসনা সুপ্রিম কোর্টের, বিচারপতিরা বললেন, “কোনো অজুহাত শুনবো না”।’
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘সুপ্রিম কোর্টে ভর্ৎসিত হলো জাতীয় নির্বাচন কমিশন। ভোটগণনার ভিডিও নেই বলে আদালতে দাবি করেছিল তারা। সেই নিয়ে তাদের সতর্ক করলো সর্বোচ্চ আদালত। ভিডিও পেশ করতে না পারলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হলো। বিচারপতিরা জানিয়েছেন, কোনো অজুহাত বরদাস্ত করা হবে না।’
ঘটনা ২০২৩ সালের। স্থান: দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটক। কিন্তু, বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন—নির্বাচন কমিশনকে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের ভর্ৎসনা বাস্তবে জ্ঞানেশ কুমারকে বাড়তি চাপে ফেলবে।
গতকাল ১৮ অক্টোবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বর্তমান-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে মহাজোট, ইন্ডিয়ার দায়ের করা মামলাকেই অগ্রাধিকার দিলো সর্বোচ্চ আদালত’।
এতে বলা হয়, ‘ভোট চুরির অভিযোগ তুলে রাহুল গান্ধির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে বিরোধী মহাজোট “ইন্ডিয়া”। এসআইআর (ভোটার তালিকা বিশেষ সংশোধন) প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে মামলা।’
প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী ২৭ অক্টোবর জ্ঞানেশ কুমারসহ অন্য ২ কমিশনারের নামে দায়ের করা সেই মামলাটির শুনানি হবে বলে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় ভারতের রাজপথে তরুণ-যুবাদের মতো দেশটির বিরোধী রাজনীতিকরাও ‘শাসক বদলের’ দাবি তুলছেন।
গত ১৬ অক্টোবর ইন্ডিয়া টুডে-র এক ভিডিও প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘ইজ রেজিম চেঞ্জ দ্য রিয়েল অবজেক্টিভ?’
সংবাদমাধ্যমটির পক্ষ থেকে কংগ্রেস নেতা ও রাজ্যসভার সদস্য পবন খেরার কাছে জানতে চাওয়া হয়—‘অনেকে এখন শাসক বদলের ডাক দিচ্ছেন। কংগ্রেসের ভাবনাও কি তাই?’
জবাবে এই কংগ্রেস নেতা জানান, ভারতে যুগে যুগে যেসব গণআন্দোলন হয়েছে সেগুলো সেসময়কার শাসকদের বিরুদ্ধে হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা সরকার বদলের ডাক দিতেন। কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও এমন আন্দোলন হয়েছে। ২০১২-১৩ সালে বিজেপির বিক্ষোভকারীরা কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘মোদি-শাহ-রাজনাথ সিংয়ের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে না। কেননা, ষড়যন্ত্র হয় গোপনে। এখানে গোপনীয়তার কিছু নেই। প্রকাশ্যেই বলা এই সরকারকে বিদায় নিতে হবে।’
এই কংগ্রেস নেতা মনে করেন, ২০২৯ সালে আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগেই বিজেপি সরকারের সরে যাওয়া উচিত।
পবন খেরা মনে করেন, ‘শাসক বদল আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার।’
এদিকে, ভারতের বর্ষীয়ান আইনজীবী ও রাজনীতিক কপিল সিবাল মনে করেন, ‘ভারত কোনো হুমকিতে নেই। মোদি-সরকার হুমকিতে।’
তার মতে, সরকার এত বেশি ভয় পেয়েছে যে জাতীয় পতাকা ওড়ানোটাকে বাধা দিচ্ছে। যাকে পাচ্ছে তাকেই আটক করছে।
বিপরীতে, বিজেপির নেতা ও মন্ত্রীরা অভিযোগ করছেন, ‘একদল পথভ্রষ্ট মানুষ বিদেশি অর্থায়নে ভারতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনেকে এই ‘সরকার বদলের’ ডাককে কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন না। তারা বলছেন, লোকসভায় যেহেতু বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই তাই শরিক দলগুলো সমর্থন তুলে নিলে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সরকারের পতন ঘটবে।
ভারতের ‘দ্বিতীয়’ স্বাধীনতা?
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়া ভারতে ‘দ্বিতীয়’ স্বাধীনতার আওয়াজ উঠছে। গত জুলাইয়ে ধর্মেন্দ্রবিরোধী আন্দোলনের সময় অনশন করেছিলেন প্রখ্যাত পরিবেশবাদী সোনাম ওয়াংচুক। সেসময় তিনি ভারতের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র কথা উল্লেখ করেছিলেন।
এরপর জ্ঞানেশবিরোধী চলমান আন্দোলনেও বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ লেখা ব্যানার ও মুখে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র জন্য আন্দোলনের কথা বলতে শোনা যাচ্ছে।
সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য মনে করেন, ভোটার তালিকা জালিয়াতির অভিযোগে আমজনতার বিক্ষোভ-সমাবেশ এবং তা দমনে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ ভারতের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র আন্দোলনকেই তুলে ধরছে।
এদিকে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা যখন ‘আজাদি’ স্লোগান তুলছেন তখন বিজেপি নেতাদের অনেকে প্রশ্ন করছেন, ‘স্বাধীন দেশে আবার আজাদি কেন?’ এমন স্লোগানধারীরা ভারতের সমৃদ্ধিকে মেনে নিতে পারছে না বলেও মন্তব্য করছেন তারা।
তবে ভারতে এখন জেন জিদের যে আন্দোলন চলছে তা আগের যেকোনো আন্দোলন থেকে আলাদা বলে মনে করছেন অনেকে।
গত ৮ অক্টোবর বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই আন্দোলনের গুরুত্ব বোঝাতে ‘নজিরবিহীন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরথ বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেছেন, ‘আজ যারা রাস্তায় নেমে আসছেন, তারা বিজেপির ভোটারদের সন্তান। তাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। এই শ্রেণির মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী ভোটারও ছিলেন। বিশেষ করে, এই নারীরাই নরেন্দ্র মোদির সমর্থনের অন্যতম বড় ভিত্তি হয়ে উঠেছিলেন।’
তিনি মনে করেন, ‘এই আন্দোলনগুলোয় যে বিপুল সংখ্যক নারী অংশ নিয়েছেন, তাতে সরকার পুরোপুরি নড়ে গেছে।’
আরতির মতে—মানুষ শিক্ষা, চাকরি ও বেকারত্বের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এগুলোর প্রভাব সারা দেশের সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে।
পরিশিষ্ট
‘মোদি সরকার বিক্ষোভ নিয়ে এত আতঙ্কিত কেন’—ভারতের ফ্রন্টলাইন সাময়িকীতে এমন প্রশ্ন রেখে এক মন্তব্য প্রকাশ করা হয়।
গত ১২ অক্টোবর প্রকাশিত সেই মতামতে বলা হয়—সরকার ভয়ে আছে যে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের বিষয়ে সিজেপির দাবিটি ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক গণআন্দোলনের রূপ নিতে পারে।
এমন বাস্তবতায় অনেকে বলছেন, তেলাপোকাদের ‘জ্ঞানেশ হটাও’ আন্দোলন নিয়ে যখন মোদি-শাহ উদ্বিগ্ন তখন তেলাপোকাদের সঙ্গে যখন ‘মাছি’ যোগ দেয় তখন তা নিশ্চয় আরও জটিল পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
বিগত বছরগুলোয় বিজেপি সরকার ভারতবাসীর নানান ক্ষোভ সামাল দিতে পারলেও এই চলমান দীর্ঘ আন্দোলন কীভাবে মোকাবিলা করবে এখন তাই দেখার বিষয়।
