প্রায় প্রতিদিনই দশ-এগারো বছরের শেফালি বিজয় সরণি মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করত। তারা দুই ভাইবোন এখানেই থাকে ফুটপাতের ওপর। নদীতে ঘর ভেঙে যাওয়ায় কুড়িগ্রাম থেকে শহরে এসেছিল মা-বাবার সাথে। কিছুদিন পর বাবা চলে গেছে ওদের ছেড়ে, মা মারা গেছে। এর মানে শেফালি আর আর ওর ভাই সিরাজ দুজনই পথশিশু। পথই ওদের ঘর, পথই ওদের পরিচয়। কয়েক মাস পর হঠাৎ শিউলিকে আর দেখা যায় না। শেফালিরা কোথায় চলে যায় বা কোথায় হারিয়ে যায়, কীভাবে হারিয়ে যায়? ধারণা করা হয়, শিউলিকে হয় কেউ তুলে নিয়ে গেছে অথবা সে নিজেই কারও সাথে চলে গেছে বা রেপ ভিক্টিম হয়ে হাসপাতালের মর্গে মরে পড়ে আছে কিংবা কোনো অজানায় হারিয়ে গেছে। এটিই আমাদের মেয়ে পথশিশুদের ভাগ্য। আর ছেলেশিশুগুলো হয় কিশোর গ্যাং, মাদকসেবী বা মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্য বা রাজনৈতিক কর্মীদের সাথী।
শেফালি ও সিরাজের মতো ঠিক কত পথশিশু বাংলাদেশে আছে, এর সঠিক কোনো সংখ্যা সরকারি গণনায় নেই। কারণ সরকার এদের নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন নয়। যদিও বাবা-মা ও পরিবার-পরিজন হারা এই শিশুদের অভিভাবক রাষ্ট্র স্বয়ং, কিন্তু রাষ্ট্রের মাথাব্যথা ও উদ্যোগ সবচেয়ে কম। সমাজেরও তেমন কোনো চিন্তাভাবনা নেই।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে আনুমানিক ৩৪ লাখের বেশি শিশু পিতা-মাতার যত্ন ছাড়া বা আংশিক/পুরোপুরিভাবে পথের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছে। এর আগের এক জরিপে বিবিএস ও ইউনিসেফ বলছে, সরাসরি রাস্তায় বসবাস ও কাজ করা ১৫-১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ঢাকায় আনুমানিক ১ লাখের বেশি এবং সারা দেশে কয়েক লাখ শিশু সরাসরি রাজপথে থাকে। এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত। মোট পথশিশুর একটি বড় অংশ (প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ) অবস্থান করে রাজধানী ঢাকা শহরের বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন, লঞ্চঘাট ও ট্রাফিক সিগন্যালগুলোয়। এছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা এবং রাজশাহীর মতো বড় বিভাগীয় শহর ও নদীবন্দরগুলোয় তাদের উপস্থিতি বেশি।
কেন পরিবার-পরিজন হারিয়ে এত শিশু পথশিশুর তালিকায় নাম লেখায়? এরা অনেকেই নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গৃহহীন হয়। পরিবারের সাথেই স্থানীয় অভিবাসী হয়ে শহরে আসে এবং এক সময় বাবা-মা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। বাসা বা পরিবারে অবহেলা ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে অনেক শিশু পালিয়ে শহরে চলে আসে। আবার একটি অংশ পাচারকারী চক্র বা দালালদের খপ্পরে পড়ে ভিক্ষুক ও টোকাই হয়ে যায়। মা-বাবার বিচ্ছেদ কিংবা বাবা-মায়ের মৃত্যুর ফলে এই শিশুরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। অবহেলা ও চরম দারিদ্র্য তাদের আশ্রয়হীন করে। তাদেরই আমরা পথশিশু হিসেবে চিনি, পথশিশু নামে ডাকি। তারাই এ দেশের ঠিকানা, পরিচয়হীন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানব সন্তান।
‘পথশিশু’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ট্রাফিক সিগনালে ফুল বিক্রেতা শিশু, বাসস্ট্যান্ডের শিশু হকার ছেলেটি, টেম্পো চালকের সহযোগী বাচ্চাটি, হাতে করে চুড়ি, চিরুনি ও রাবারব্যান্ড বিক্রেতা ছোট্ট মেয়েটি, কিংবা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চট বিছিয়ে শুয়ে থাকা অসহায় কিছু শিশু মুখ। যে বয়সে তাদের মা-বাবার কোলে থাকার কথা, স্কুলে যাওয়া, মাঠে খেলা ও নেচে-গেয়ে আনন্দ করার কথা; সেই বয়সেই এ দেশের লাখ লাখ শিশু-কিশোরের জীবন থমকে গেছে রাস্তার ধুলোবালিতে, হাটে-বাজারে, অপরাধীদের আস্তানায় এবং যৌনপল্লীতে। এই বাচ্চাগুলো আমাদের সমাজেরই সন্তান। কিন্তু চরমভাবে উপেক্ষিত। পথশিশুরা অভিভাবকহীন বলেই বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও শিক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। কিন্তু তা তো হওয়ার কথা নয়। এই পথশিশুদের দেখাশোনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাদের সুরক্ষা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক।
সংবিধান, জাতীয় শিশু নীতি ও আন্তর্জাতিক সনদ বলছে, পথশিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হচ্ছে তাদের সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা দেওয়া। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। শুধু তাই নয়, বলা হচ্ছে অভিভাবক ও আশ্রয়হীন এই শিশুদের অবহেলা ও শোষণ থেকে সুরক্ষা দেবে রাষ্ট্র। শিশুদের সুবিধার্থে বিশেষ বিধান তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র পথশিশুদের যেকোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ও শ্রম শোষণ থেকে সুরক্ষা দিতে বাধ্য। একই সাথে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিকল্প যত্ন, বিনামূল্যে চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান ও সেফ হোম স্থাপন, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ও সুরক্ষার দায়িত্ব সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর অর্পিত। সংবিধান অনুযায়ী পথশিশুদের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। অথচ রাষ্ট্র কি সেই দায়িত্ব পালন করছে? না করছে না। এই বিষয়ে রাষ্ট্রের তেমন কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ে না।
পথশিশুদের একটি সুস্থ জীবন দেওয়া শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, বরং সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি সংবেদনশীল ও সচেতন হয়, তাহলে যে কোনো বড় সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬
