আলমারিতে সঞ্চয় করে রাখা দুই লাখ টাকা ইঁদুর ও উইপোকা কেটে টুকরো টুকরো করেছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সারা জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন ৭২ বছর বয়সী কৃষক তোফাজ্জল হোসেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার দুর্দশার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের পাঠানো দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন গাইবান্ধার সেই প্রান্তিক কৃষক।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ওয়াসা ভবনে কৃষক তোফাজ্জল হোসেনের হাতে এই অর্থ সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
তিনি বলেন, ‘মানবিকতার কোনো সীমারেখা নেই। ধর্ম নেই, বর্ণ নেই, গোত্র নেই। মানবিকতার জন্য লাগে না কোনো পাসপোর্ট, কোনো ভিসা। শুধু লাগে মমত্ব ও ভালোবাসা। আজকের এই আয়োজন কেবল একজন প্রান্তিক কৃষক তোফাজ্জল হোসেনকে আর্থিক সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠান নয়। এটি একটু সহানুভূতি ও ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত। ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকের জমানো অর্থ ইঁদুর ও উইপোকায় নষ্ট করে ফেলেছে জেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের জমানো ২ লাখ টাকা দিয়ে দেশের মানুষের প্রতি মানুষের মানবিকতার নজির স্থাপন করেছেন।’
তিনি আর বলেন, ‘এর মাধ্যমে দেশের প্রতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশপ্রেম আবারও জোরালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষের জীবনমান ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান সরকার অসহায়, দরিদ্র, কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।’
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিনিয়র সাংবাদিক সালেহ উদ্দিন, কৃষক তোফাজ্জল হোসেনের বড় মেয়ে মোসাম্মত মোর্সেদা, গাইবান্ধার স্থানীয় সাংবাদিক ইদ্রিসউজ্জামান মোনা প্রমুখ।
সাংবাদিক সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘কৃষক তোফাজ্জল হোসেনের নষ্ট হয়ে যাওয়া দুই লাখ টাকা শুধু অর্থ নয়; এটি তার ঘাম, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার প্রতীক। একজন প্রান্তিক কৃষকের সারা জীবনের পরিশ্রমের সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ব্যাথিত করে। এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে দেশে-বিদেশে যারা যুক্ত হয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। মানুষের বিপদে মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে- এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। মানবিকতার এই ধরণের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। তবে আমাদের সমাজে নানা ধরণের ‘উইপোকা’ বাস করে, যারা মানুষের স্বপ্নকে ধ্বংস করতে চায়। এদের দমন করতে হবে।’
উল্লেখ্য, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের ধুমাইটারি গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন একজন গরীব অসহায় কৃষক। তার কোনো ছেলে নেই, ৩ মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। মেয়েদের অনেক কষ্ট করে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। তোফাজ্জল হোসেন আগে ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বয়সের ভারে রিকশা চালাতে না পারায় গ্রামে ফিরে এসে কয়েক বছর আগে থেকেই অন্যের দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করতেন। স্ত্রী ফাতেমা বেগম এবং তোফাজ্জল হোসেন এই দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে কোন রকম সংসার চালাতেন। ৭২ বছর বয়সী গরীব এই কৃষকের আলমারিতে জমানো ২ লাখ টাকা উইপোকা ও ইঁদুর কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে। টুকরো টাকাগুলোকে সামনে নিয়ে কৃষক তোফাজ্জল হোসেনের আর্তনাদের দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
