মো. বেল্লাল হাওলাদার
নিরাপদ খাদ্য, নির্ভুল রোগ নির্ণয়, রোগীর নিরাপত্তা, মানসম্মত শিল্পপণ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার ও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (বিএবি) কার্যক্রমের প্রশংসা করে তারা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটির সেবা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন খাতে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং অ্যাক্রেডিটেশনের বিষয়ে সচেতনতা ও আস্থা বাড়ছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) আয়োজিত ‘নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে অ্যাক্রেডিটেশনের ভূমিকা’ শীর্ষক নীতিনির্ধারণী গোলটেবিল আলোচনা ও কর্মশালায় এসব কথা উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। এতে বিএবির মহাপরিচালক মোহা. আমিনুল ইসলাম, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. নুরুজ্জামান এনডিসিসহ খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষাগার, মান নিয়ন্ত্রণ, শিল্প ও বাণিজ্য এবং অ্যাক্রেডিটেশন সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন অংশীজন অংশ নেন।
সভাপতির বক্তব্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, অ্যাক্রেডিটেশনকে শুধু কারিগরি বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, শিল্পের সক্ষমতা, ভোক্তার অধিকার, রপ্তানি বাণিজ্য এবং জনগণের আস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, একটি পরীক্ষাগারের পরীক্ষার ফলাফল, পরিদর্শন প্রতিবেদন, যন্ত্রের পরিমাপ সনদ বা সনদায়নের গ্রহণযোগ্যতা তখনই তৈরি হয়, যখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতার বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নিশ্চয়তা থাকে। অ্যাক্রেডিটেশন সেই আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু একটি মন্ত্রণালয় বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার একক দায়িত্ব নয়। খাদ্য উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ, মোড়কজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ—প্রতিটি পর্যায়ে মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, দুগ্ধ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষাব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্যসেবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারের ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাসপাতাল ও চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি রোগ নির্ণয় সেবার গুণগত মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা পরীক্ষাগারের অ্যাক্রেডিটেশন এ ক্ষেত্রে একটি কাঠামোবদ্ধ মানব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অ্যাক্রেডিটেশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব। এতে রপ্তানিমুখী শিল্প ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিদেশে পুনরায় পরীক্ষা ও সনদায়নের প্রয়োজন কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, যা সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ে সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে, বিএবির মহাপরিচালক মোহা. আমিনুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ খাদ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফলাফল অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অ্যাক্রেডিটেশন পরীক্ষাগারের কারিগরি সক্ষমতা, গুণগত মান ব্যবস্থাপনা ও ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তিনি বলেন, বিএবি বর্তমানে পরীক্ষা, পরিমাপক যন্ত্রের মান যাচাই, চিকিৎসা পরীক্ষাগার, পরিদর্শন ও সনদায়ন কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী অ্যাক্রেডিটেশন প্রদান করছে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সক্ষমতা, জনবলের দক্ষতা, গুণগত ব্যবস্থাপনা এবং পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
মহাপরিচালক বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত খাদ্য পরীক্ষাগারের মাধ্যমে খাদ্যে জীবাণু, ভেজাল, ভারী ধাতু, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশসহ বিভিন্ন দূষক নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। একইভাবে চিকিৎসা পরীক্ষাগারের অ্যাক্রেডিটেশন রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা, রোগীর নিরাপত্তা এবং চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে সহায়ক।
তিনি আরও বলেন, এখন শুধু অ্যাক্রেডিটেশনের পরিধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর ব্যবহার ও বাস্তব প্রভাব নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং শিল্প ও রপ্তানি খাতে অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত পরীক্ষার ফলাফল আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পরীক্ষাগার, বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবী প্রতিনিধিরা বিএবির কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তারা বলেন, দেশের গুণগত মান অবকাঠামো শক্তিশালী করতে বিএবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিভিন্ন খাতের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা ও মানসম্মত সেবার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
তারা আরও বলেন, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিএবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরীক্ষাগার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যাচাইয়ের যে ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, তা ভোক্তা আস্থা ও সেবার মান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
আলোচনায় উঠে আসে, দেশের চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষাগারের একটি বড় অংশ এখনো অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় আসেনি। বিএবির উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৩৯২টি পরীক্ষাগারের মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত এবং প্রায় ৩১ শতাংশ পরীক্ষাগার অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণে আগ্রহী।
এ অবস্থায় সরকারি চিকিৎসা, খাদ্য, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ পরীক্ষাগারকে ধাপে ধাপে অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় আনা, দক্ষ জনবল তৈরি, পরীক্ষাগারের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির উন্নয়ন, গুণগত মান ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচনায় স্বাস্থ্য, খাদ্য, কৃষি, শিল্প, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরীক্ষাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার তদারকিতে অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত পরীক্ষার ফলাফলের কার্যকর ব্যবহার, সরকারি পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্প ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য মানসম্মত পরীক্ষা ও সনদায়ন সেবা এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষাগারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে না দেখে জাতীয় গুণগত অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য, নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা, ভোক্তা আস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব।
সভায় অ্যাক্রেডিটেশনের ক্ষেত্রে জাতীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সরকারি পরীক্ষাগারের ধাপভিত্তিক অ্যাক্রেডিটেশন, মানবসম্পদ ও কারিগরি সক্ষমতা উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচনা শেষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিএবির সমন্বয়ে খাদ্য ও স্বাস্থ্য পরীক্ষাগার অ্যাক্রেডিটেশনবিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ও রোডম্যাপ প্রণয়নের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, অগ্রাধিকার ক্ষেত্র, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং বাস্তবায়ন সময়সীমা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।
সমাপনী বক্তব্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, এখন অ্যাক্রেডিটেশনের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি এর কার্যকর ব্যবহার ও বাস্তব প্রভাব নিশ্চিত করার দিকে নজর দিতে হবে। একটি শক্তিশালী অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিল্প, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও রপ্তানি খাতের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং অন্যান্য অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
আয়োজক বিএবি জানায়, নিরাপদ খাদ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে অ্যাক্রেডিটেশনের কার্যকর ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং দেশের জাতীয় গুণগত অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
