এক ডাক্তার বন্ধুর বাবা মিশর থেকে স্টকহোমে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি সুইডেনে (জনসংখ্যা নিবন্ধিত) ছিলেন না এবং একজন ভিজিটর হিসেবে এসেছিলেন। একদিন হঠাৎ তার শ্বাস নিতে কষ্ট হলো। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলো। অক্সিজেন দিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হলো। প্রায় আট ঘণ্টা পর তিনি সুস্থ বোধ করলেন। হাসপাতাল থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো।
বের হওয়ার সময় বন্ধুর হাতে চিকিৎসার বিল তুলে দেওয়া হলো। বাবা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিল কত হয়েছে?’ ছেলে বলল, ‘আশি হাজার সুইডিশ ক্রোনার।’
বিজ্ঞাপন
বৃদ্ধ বাবা হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। ছেলে বেশ বিভ্রান্ত হয়ে বলল, ‘বাবা, তুমি কাঁদছ কেন? টাকার জন্য? আমার কাছে তো এটা সামান্য টাকা।’
বাবা চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, ‘টাকার জন্য কাঁদছি না বাবা। কাঁদছি অন্য কারণে। আমি সত্তর বছর ধরে শ্বাস নিচ্ছি। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। কোনোদিন একটি পয়সাও দিতে হয়নি। অথচ মাত্র আট ঘণ্টা নিজের মতো করে শ্বাস নিতে পারলাম না বলে এত টাকা দিতে হলো। তাহলে সত্তর বছর ধরে যে পরিমাণ অক্সিজেন বিনামূল্যে পেয়েছি, তার মূল্য কত? আর সেই ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব?’
বিজ্ঞাপন
কথাটি শুনে ছেলে আর কিছু বলতে পারেনি।
ঘটনাটি সত্যি কতটা, তার হিসাবের চেয়ে কথাটির ভেতরের সত্যটাই বড়। আমরা জীবনে এমন কত কিছু বিনামূল্যে পেয়ে যাই, যার মূল্য বুঝতে পারি কেবল যখন সেটি হঠাৎ আমাদের নাগালের বাইরে চলে যায়।
শ্বাস নেওয়া তার সবচেয়ে সহজ উদাহরণ। অক্সিজেন আমাদের চারপাশে আছে বলে আমরা তার কথা ভাবি না। বাতাস আছে বলে তার মূল্য নেই বলে মনে হয়। অথচ কয়েক মুহূর্তের জন্য শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পেলে জীবনের অর্থই বদলে যায়।
বিজ্ঞাপন
এই ছোট্ট ঘটনাটি আমাকে একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: যে জিনিসগুলো আমরা প্রতিদিন এত সহজে পাই, সেগুলোর কোনো একটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে আমরা কেমন অনুভব করব?
এবার একটু বড় করে ভাবা যাক।
বিজ্ঞাপন
ধরুন, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, পৃথিবী ঠিক আগের মতোই আছে। সূর্য উঠেছে। পাখিরা ডাকছে। নদী বয়ে যাচ্ছে। গাছের পাতায় বাতাস লাগছে। বৃষ্টি হচ্ছে। ঋতু বদলাচ্ছে।
শুধু মানুষের তৈরি সবকিছু থেমে গেছে।
বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল ফোন কাজ করছে না। ইন্টারনেট নেই। গাড়ি চলছে না। বিমান আকাশে উঠছে না। কারখানার মেশিন থেমে গেছে। ব্যাংকের সার্ভার বন্ধ। কম্পিউটার নীরব। হাসপাতালের আধুনিক যন্ত্রপাতি অচল। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে কোনো খবর পৌঁছাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
প্রথমে মানুষ বুঝতেই পারবে না কী ঘটেছে। তারপর ভয় শুরু হবে।
কিন্তু ভয় কিছুটা কেটে গেলে হয়তো আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আসবে: মানুষের তৈরি এই বিশাল সভ্যতা ছাড়া মানুষ নিজে আসলে কতটা সক্ষম?
মানুষের সৃষ্টির শুরুতে তার হাতে ছিল না বিদ্যুৎ, গাড়ি, বিমান, কম্পিউটার কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি। ছিল না হাসপাতাল, ব্যাংক, কারখানা কিংবা বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা।
বিজ্ঞাপন
ছিল একটি মস্তিষ্ক, দুটি হাত, প্রকৃতিকে দেখার চোখ, কৌতূহল এবং বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছা।
মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছিল। পাথর দিয়ে হাতিয়ার বানিয়েছিল। শিকার করেছিল। পরে বীজ বুনতে শিখেছিল, পশু পোষ মানিয়েছিল, আশ্রয় বানিয়েছিল। ভাষা তৈরি করেছিল। পরিবার গড়েছিল। দলবদ্ধ হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
এক প্রজন্ম যা শিখেছে, পরের প্রজন্ম তার ওপর নতুন কিছু যোগ করেছে। এভাবেই মানুষ শুধু সময় পার করেনি, জ্ঞান জমিয়েছে।
সেই জ্ঞান থেকে এসেছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞান থেকে এসেছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তি থেকে এসেছে এমন এক সভ্যতা, যা মানুষের জীবনকে অভাবনীয়ভাবে সহজ করেছে।
আজ একটি সুইচ চাপলে আলো জ্বলে। একটি ফোনে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়। একটি বিমানে কয়েক ঘণ্টায় মহাদেশ পেরিয়ে যাওয়া যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান এমন সব রোগের বিরুদ্ধে লড়ছে, যেগুলো একসময় মৃত্যুর প্রায় নিশ্চিত কারণ ছিল। কম্পিউটার কয়েক সেকেন্ডে এমন হিসাব করতে পারে, যা একসময় করতে মানুষের বহু বছর লেগে যেত।
মানুষ সত্যিই অসাধারণ কিছু তৈরি করেছে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন জন্ম নেয়। মানুষ যত বেশি তৈরি করেছে, সে কি তত বেশি নিজের তৈরি জগতের ওপর নির্ভরশীলও হয়ে পড়েছে?
একসময় মানুষ আগুন জ্বালাতে পারত। আজ অনেক মানুষ জানে না কীভাবে আগুন জ্বালাতে হয়। একসময় মানুষ প্রকৃতির লক্ষণ দেখে আবহাওয়া বোঝার চেষ্টা করত। আজ আমরা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করি। একসময় মানুষ সূর্য, নদী, পাহাড় ও নক্ষত্র দেখে পথ চিনত। আজ অনেকের কাছে পথ দেখানোর জন্য একটি যন্ত্র প্রয়োজন। একসময় মানুষ নিজের খাবারের অনেকটাই নিজে সংগ্রহ বা উৎপাদন করত। আজ শহরের দোকানের তাক কয়েক দিনের জন্য খালি হয়ে গেলেই উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
এগুলো সভ্যতার ব্যর্থতা নয়। বরং সভ্যতার সাফল্যই আমাদের এই নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে।
মানুষ জীবনকে সহজ করেছে।
কিন্তু সহজ জীবন কি মানুষকে তার কিছু মৌলিক সক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে?
হঠাৎ সবকিছু থেমে গেলে এই প্রশ্নটির উত্তর আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে।
টাকা থাকবে, কিন্তু ব্যাংক থাকবে না। গাড়ি থাকবে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ থাকবে না। বাড়ি থাকবে, কিন্তু বিদ্যুৎ থাকবে না। হাসপাতাল থাকবে, কিন্তু তার আধুনিক ব্যবস্থা থাকবে না। শহর থাকবে, কিন্তু শহরকে সচল রাখার ব্যবস্থা থাকবে না।
তখন হয়তো আমরা প্রথমবার বুঝব, কোনো জিনিসের মূল্য শুধু তার দামের মধ্যে থাকে না।
অক্সিজেনের মূল্য আমরা তখন বুঝি, যখন শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। পানির মূল্য বুঝি, যখন পানি থাকে না। খাবারের মূল্য বুঝি, যখন খাবার পাওয়া যায় না। বিদ্যুতের মূল্য বুঝি, যখন অন্ধকার নেমে আসে। যোগাযোগের মূল্য বুঝি, যখন প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয় না।
আর একজন মানুষের মূল্য?
হয়তো তাকে তখন আর তার ব্যাংক ব্যালান্স দিয়ে মাপা যাবে না। পদবি দিয়ে নয়। গাড়ি দিয়ে নয়। বাড়ির আকার দিয়ে নয়।
তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে সে কী জানে, কী করতে পারে, বিপদের সময় অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারে কি না এবং একসঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য কতটা সহযোগিতা করতে পারে।
একজন কৃষকের জ্ঞান তখন গুরুত্বপূর্ণ হবে। একজন কারিগরের হাত গুরুত্বপূর্ণ হবে। একজন চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হবে। একজন মায়ের বহুদিনের সঞ্চিত ব্যবহারিক জ্ঞানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তখন হয়তো আমরা বুঝব, জ্ঞান শুধু বই, বিশ্ববিদ্যালয় বা কম্পিউটারের মধ্যে থাকে না।
জ্ঞান মানুষের মধ্যেও থাকে।
আর মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো একটি যন্ত্র নয়। তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শেখার ক্ষমতা।
মানুষ একদিন কিছুই জানত না। তারপর প্রশ্ন করতে শিখেছে। পর্যবেক্ষণ করতে শিখেছে। ভুল করতে শিখেছে। ভুল থেকে আবার শিখেছে। একজনের জ্ঞান আরেকজনের কাছে দিয়েছে। সেই জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়েছে।
এই ধারাবাহিকতাই সভ্যতা তৈরি করেছে।
তাই মানুষের তৈরি সবকিছু যদি কোনোদিন থেমেও যায়, মানুষ হয়তো আবার শুরু করতে পারবে।
কিন্তু সেই শুরু হবে কোথা থেকে?
হয়তো আগুন থেকে। হয়তো মাটি থেকে। হয়তো পানি থেকে। হয়তো একটি বীজ থেকে। আর অবশ্যই মানুষের নিজের চিন্তা থেকে।
কারণ সভ্যতার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার কোনো যন্ত্র নয়। সভ্যতার পেছনে যে শক্তিটি কাজ করেছে, সেটি হলো মানুষের কৌতূহল।
মানুষ জানতে চেয়েছে। তারপর চেষ্টা করেছে। ব্যর্থ হয়েছে। আবার চেষ্টা করেছে।
এভাবেই পাথরের হাতিয়ার থেকে চাকা, চাকা থেকে ইঞ্জিন, ইঞ্জিন থেকে বিমান, বিমান থেকে মহাকাশযান, আর আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত এসেছে।
কিন্তু এই বিশাল অগ্রগতির মাঝেও একটি সত্য কখনো বদলায়নি।
মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়।
মানুষের তৈরি পৃথিবী থেমে গেলেও পৃথিবী নিজে থামবে না।
সূর্য উঠবে। বৃষ্টি হবে। নদী বয়ে যাবে। গাছ জন্মাবে। পাখি উড়বে। ঋতু বদলাবে।
প্রকৃতি কোনো ব্যাংকের সার্ভার, কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক, কোনো কারখানা কিংবা কোনো কম্পিউটারের ওপর নির্ভর করে না।
তখন হয়তো মানুষ প্রথমবার খুব গভীরভাবে বুঝবে:
আমরা পৃথিবীকে চালাই না। আমরা পৃথিবীর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকি।
হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করেছে, তাকে ব্যবহার করেছে, তাকে পরিবর্তন করেছে। কখনো কখনো এমনও ভেবেছে, মানুষ হয়তো প্রকৃতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু একটি শ্বাসই সেই ধারণাকে বদলে দিতে পারে।
সেই বৃদ্ধ বাবার মতো তখন হয়তো আমরাও প্রশ্ন করব:
আমি যে বাতাস এতদিন বিনামূল্যে পেয়েছি, তার মূল্য কত?
যে পানি পেয়েছি, তার মূল্য কত?
যে আলো পেয়েছি, তার মূল্য কত?
যে মাটি আমাকে খাদ্য দিয়েছে, তার মূল্য কত?
যে গাছ আমাকে ছায়া দিয়েছে, তার মূল্য কত?
আর যে পৃথিবী আমাকে জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত বয়ে নিয়ে এসেছে, তার ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব?
হয়তো এই প্রশ্নগুলোর কোনো আর্থিক উত্তর নেই।
কারণ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলোর অনেকগুলোরই কোনো দাম নেই।
আমরা তাদের মূল্য বুঝতে পারি তখনই, যখন তারা হঠাৎ আমাদের কাছ থেকে সরে যায়।
তাই হয়তো পৃথিবী থেমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মানুষের তৈরি সবকিছু থেমে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই।
শুধু মাঝে মাঝে আমাদের নিজেদের থামতে হবে।
মোবাইলটা পাশে রাখতে হবে। পর্দা থেকে চোখ সরাতে হবে। কিছুক্ষণ নীরবে আকাশের দিকে তাকাতে হবে। একটি গাছের দিকে তাকাতে হবে। প্রিয় মানুষের পাশে বসতে হবে। একটি গভীর শ্বাস নিতে হবে।
তারপর মনে করতে হবে, এই শ্বাসটি আমি কত বছর ধরে বিনামূল্যে নিয়ে আসছি।
হয়তো তখন আমরা বুঝতে পারব, সভ্যতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু কীভাবে আরও বেশি তৈরি করা যায় তা নয়।
কখন থামতে হয়, কীসের ওপর আমরা নির্ভর করে আছি, এবং যা প্রতিদিন বিনা মূল্যে পাচ্ছি তার মূল্য কীভাবে বুঝতে হয়, সেটিও শেখা দরকার।
সেদিন সেই বৃদ্ধ মানুষটি আশি হাজার ক্রোনারের বিল দেখে কেঁদেছিলেন।
কিন্তু হয়তো তাঁর কান্নার ভেতরে ছিল আরও বড় একটি হিসাব।
সত্তর বছরের প্রতিটি শ্বাসের হিসাব।
সেই হিসাবের কোনো বিল নেই। কোনো ব্যাংক নেই। কোনো ঋণপত্র নেই।
তবু ঋণ আছে।
আমাদের প্রত্যেকের।
আর সেই ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হয়তো টাকা নয়।
আমরা যে বাতাসে বেঁচে আছি, যে পৃথিবী আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, এবং যে মানুষগুলো আমাদের পাশে আছে, তাদের মূল্য বুঝে বাঁচা।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
