মণিদীপ সাহা
একটা সাম্রাজ্যকে সত্যিই কী ভয় দেখায়? বন্দুক, বিপ্লবী, নাকি একটা বই? বন্দুকের শব্দ একসময় থেমে যায়। বিপ্লবীকে কারারুদ্ধ করা যায়। কিন্তু একটা ধারণাকে? একটা প্রশ্নকে? একটা শব্দকে?
সেখানেই সাহিত্যের বিপজ্জনক ক্ষমতা। তাই কলম যখন অস্ত্র হয়ে ওঠে, আর শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকে বারুদের গন্ধ—তখন সাহিত্য আর নিছক সাহিত্য থাকে না, হয়ে ওঠে বিপ্লবের ভাষা।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ কেবল একটি উপন্যাস নয়; এটি এমন এক সময়ের সাহিত্যিক দলিল, যখন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনে নয়, মানুষের চিন্তাতেও বিস্তার লাভ করছিল। আর সেই সাহিত্য, তার স্রষ্টা এবং বিপ্লবী কল্পনার সংঘাতকে কেন্দ্র করে পরিচালক সৃজিত মুখার্জির সিনেমা, নন্দী মুভিজ নিবেদিত ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি রাখে, তা বেশ আকর্ষণীয়—একজন লেখক কি তাঁর সময়কে শুধু লিপিবদ্ধ করেন, নাকি তাঁর লেখা সেই সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অস্ত্রও হয়ে উঠতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ছবিটিকে শুধু একটি সময়কালীন নাটক হিসেবে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, পরিচালক ইতিহাসকে কীভাবে ব্যবহার করছেন, সাহিত্যকে কীভাবে সিনেমার ভাষায় অনুবাদ করছেন, আর বাস্তব ও কল্পনার মাঝখানে ঠিক কোন জায়গায় নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, পুজোর সময় হঠাৎ বিপ্লবের গল্প কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে একটি শব্দে—‘ভক্তি’। পুজোয় ভক্তি নিজের আত্মার সঙ্গে, আর বিপ্লবে ভক্তি দেশের স্বাধীনতার সঙ্গে। এবার ‘ভক্তি’ শব্দ থেকেই জন্ম নেয় আরও দুটি শব্দ—ভক্ত এবং তাঁর ভগবান।

পরিচালক সৃজিত মুখার্জির ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ সিনেমায় যখন ভগবান স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তখন তাঁর নীরব ভক্ত কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আবার যেখানে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই ভগবান, সেখানে তাঁর ভক্ত তাঁরই সৃষ্ট এক একটি চরিত্র, যাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান সব্যসাচী, ওরফে ডাক্তার। আর এঁরা যখন সকলেই ভক্ত, তখন তাঁদের ভগবান এক এবং একমাত্র—দেশের স্বাধীনতা। সেটাই তাঁদের পুজো। সেটাই তাঁদের বিপ্লব। এবার আসা যাক ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ সিনেমার নির্মাণশৈলীর বিষয়ে।
‘রিয়্যালিটি ব্রেক’—অর্থাৎ বাস্তবতাকে প্রশ্ন করা।
আন্দ্রেই তারকোভস্কি থেকে ক্রিস্টোফার নোলান—সিনেমার ভাষায় বাস্তবতাকে প্রশ্ন করার এই প্রবণতা বিভিন্ন পরিচালক তাঁদের ছবিতে দেখিয়ে এসেছেন। পরিচালক সৃজিত মুখার্জিও তাঁর প্রথম সিনেমা ‘অটোগ্রাফ’ থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সিনেমাতেই এই নির্মাণশৈলীর ছাপ রেখে চলেছেন। তবে ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ সিনেমায় এই ভাবনা যেন ধরা দিয়েছে এক নতুন, পরিবর্তিত রূপে।
একটু ভেবে দেখুন। আমরা যখন কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জীবনী দেখি, তখন সাধারণত প্রত্যাশা করি পরিচিত ঘটনাগুলির একটি সুসংহত পুনর্নির্মাণ। আবার সাহিত্যনির্ভর সিনেমায় আমরা চাই, কল্পনার জগৎ তার নিজস্ব নিয়মে বেঁচে থাকুক। কিন্তু যখন একটি সিনেমা এই দুই জগতের সীমারেখা অস্পষ্ট করে দেয়, তখন দর্শকের প্রত্যাশাও বদলে যায়। সে আর শুধু জানতে চায় না, কী ঘটেছিল। সে জানতে চায়, বাস্তবকে আমরা যেভাবে জানি, সেই ধারণাটাই কি প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে পারে?
পরিচালক শুধু সিনেমার মধ্যে একটি উপন্যাস, তার লেখক অথবা সেই উপন্যাসের কোনও চরিত্রকে নিয়ে গল্প বলেননি। বরং এই তিনটি স্তরকেই সমান্তরালভাবে গল্পের মধ্যে রেখেছেন। আর সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। কোনটা বাস্তবের পরিসর, আর কোনটা পরাবাস্তবের? নায়ক কে? পথের দাবী-র লেখক স্বয়ং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়? নাকি তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্র সব্যসাচী? নাকি সেই কাল্পনিক চরিত্রের বাস্তব প্রতিরূপ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু?
পরিচালক নিজেই কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে তার বাস্তব প্রতিরূপের সংযোগ স্থাপন করেছেন। আর বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিপ্লব কখনও থেমে থাকে না; বিপ্লব আসলে এক প্রবহমান স্রোত।
এখানে একটি পার্থক্য জরুরি—সাংস্কৃতিক বা আদর্শগত অনুরণনকে সরাসরি ঐতিহাসিক সমীকরণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। সিনেমার কাজ যদি এই অনুরণন তৈরি করা হয়, তবে তাকে দেখতে হবে সিনেমার নির্মিত ভাষা হিসেবে; ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়।
এবার আসা যাক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কথায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রে অভিনেতা টোটা রায়চৌধুরীকে দেখে বারবার মনে হবে, বাংলা সিনেমা তাঁকে এত কম কেন ব্যবহার করেছে! টোটা রায়চৌধুরী যেন তাঁর শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে হয়ে উঠেছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। হাঁটাচলা, অঙ্গভঙ্গি, কণ্ঠের ওঠানামা—এমনকী সিনেমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গলায় একটা হালকা কাশি বজায় রাখা, যা চরিত্রটির একেবারে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য—সব মিলিয়ে পর্দায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে যেন জীবন্ত করে তুলেছেন টোটা রায়চৌধুরী। অবশ্যই এই প্রসঙ্গে রূপসজ্জাশিল্পী সোমনাথ কুণ্ডুর কথাও বলতে হয়। তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, তাঁর হাতে সত্যিই জাদু আছে।

এরপর আসা যাক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্ট নায়ক সব্যসাচীর চরিত্রে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই সব্যসাচীর চরিত্রে এর আগে অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক স্বয়ং উত্তমকুমার। তাই নতুন সব্যসাচীর ভূমিকায় অভিনয় করা আবির চ্যাটার্জির উপর প্রত্যাশার চাপ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আবির চ্যাটার্জি তাঁর দক্ষ অভিনয় দিয়ে বাধ্য করেছেন আগের সবকিছুকে সম্মান জানিয়েও নতুন এই সব্যসাচীকে নতুনভাবে গ্রহণ করতে। ঠিক যেন মহালয়ার দিনের মতো! যেখানে একদিকে তর্পণের মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের সম্মান জানাই, অন্যদিকে দেবীর চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে নতুনকে স্বাগত জানাই। ঠিক তেমনভাবেই আবির চ্যাটার্জি সব্যসাচীর এই চরিত্রে যেন নতুন করে চক্ষুদান করেছেন। তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, বাঙালির কাছে ‘নায়ক’ বলতে যে ব্যক্তিত্বের কথা মনে আসে, তিনি ঠিক তেমনই একজন অভিনেতা।
শরৎচন্দ্রের চরিত্রে টোটা অনেকটাই সংযত, সূক্ষ্ম ও মিতভাষী। ঠিক সেখানেই সব্যসাচীর চরিত্রে আবির অনেক বেশি বৃহৎ পরিসরের, নাটকীয় অভিনয়শৈলীতে উজ্জ্বল। অথচ এই দুই বিপরীতধর্মী অভিনয়শৈলী পুরো সিনেমা জুড়ে এক অদ্ভুত ভারসাম্য বজায় রেখেছে।
নবাগতা দিব্যাণী মণ্ডল এবং ঋক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়ও বেশ যথাযথ। ভারতী চরিত্রে দিব্যাণী মণ্ডলের মুখে ছিল সারল্য, আর চোখে ছিল বিপ্লবের আগুন। সে সাধারণ হয়েও যেন কোথাও গিয়ে অসাধারণ হয়ে ওঠে।
সুমিত্রার চরিত্রে অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী বারবার মনে করিয়ে দেন, দেশটা যেমন সকলের, তেমনই দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইও সকলের। অনেকটা মা দুর্গার প্রতিমা তৈরির মতো, যে সমাজ দেহব্যবসায় যুক্ত মানুষদের আলাদা করে রাখে, সেই সমাজই কিন্তু মা দুর্গার মূর্তি গড়ার প্রথম মাটি সংগ্রহ করে তাঁদেরই কাছ থেকে। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক সত্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রে অভিনেতা সঞ্জয় নাগ এবং তাঁর কণ্ঠে কবি জয় গোস্বামী—পরিচালক সৃজিত মুখার্জির পক্ষ থেকে যেন এক নীরব শ্রদ্ধার্ঘ, পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রতি।
চন্দ্রমুখীর চরিত্রে কৌশানী মুখার্জিও একটা প্রশ্ন রেখে গেলেন—বাংলায় চন্দ্রমুখীকে নিয়ে আলাদা করে সিনেমা করা যায় না? দেবদাসকে নিয়ে তো এত সিনেমা হয়েছে। এবার বোধহয় চন্দ্রমুখীকে নিয়েও একটা সিনেমা হওয়া দরকার।
গল্পের অন্যান্য অভিনেতারাও, যেমন নিমাই রায়ের চরিত্রে কাঞ্চন মল্লিক, ব্রজেন্দ্রর চরিত্রে তথাগত মুখার্জি এবং আয়ারের ভূমিকায় দেবপ্রিয় মুখার্জি—প্রত্যেকেই যেন মা দুর্গার হাতে এক একটি অস্ত্র তুলে দেওয়ার মতো সিনেমায় নিজেদের উপস্থিতি ও গুরুত্ব প্রমাণ করে গেছেন।
এবার আসা যাক ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ সিনেমার সংগীতের বিষয়ে।
পরিচালক সৃজিত মুখার্জি এই সিনেমায় প্রথমবার সংগীত পরিচালনার দায়িত্বও সামলেছেন। বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে প্রেমের গান কিংবা রবীন্দ্রসংগীতের যথাযথ ব্যবহার, আবার হঠাৎ সেই আবহ ভেঙে ঠুমরির মাধ্যমে একেবারে অন্য রকমের আসর তৈরি করা—সবটাই সৃজিত করেছেন নিপুণতার সঙ্গে। যা পরিচয় দেয় সংগীতের পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠার এবং সংগীত সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধির।
একদিকে ঈশান মিত্র ও তিমির বিশ্বাসের কণ্ঠে সুফিয়ানা মেজাজ, অন্যদিকে শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠে মাদকতা, আর তার সঙ্গে অন্তরা ভট্টাচার্যের কণ্ঠে নান্দনিক সারল্য—এই সবকিছুর মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে সংগীতশিল্পী ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের তৈরি সিনেমার আবহসংগীত।
এই সংগীত যেন সিনেমাকে কোথাও আটকে রাখে না, বরং তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাস্তবের সঙ্গে কাল্পনিকের বন্ধন স্থাপন করে। গল্পের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে তৈরি করে এক অনন্য সেতু।
শেষে বলি, ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ আসলে অত্যাচার বনাম স্বাধীনতার গল্প, ক্ষমতা বনাম বিপ্লবের গল্প, দুর্গা বনাম অসুরের গল্প। যে গল্পে বিপ্লবের মধ্যে ভক্তি আছে, আবার ভক্তির মধ্যেও রয়েছে বিপ্লব।
