ইন্টারনেটের বড় একটি অংশ পরিচালনায় ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে ভয়াবহ নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে উদ্বেগ। ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থা ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইট দ্রুত পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েব সাইট স্লো করে রাখা হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
তিনি বলেন, শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেতে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি ডিপার্টমেন্ট কাজ করছে।এদিকে, বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিএইচপির এই নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় শনাক্ত করা হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। ধারণা করা হচ্ছে, ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ওয়েবসাইট কোনো না কোনোভাবে এই ঝুঁকির আওতায় থাকতে পারে।
ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। দ্রুত ত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে পিএইচপির ত্রুটি সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার সংস্করণ ও নিরাপত্তা প্যাচ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্স ও ফিনল্যান্ডের সরকার ঝুঁকিপূর্ণ কিছু ওয়েবসেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও নিজেদের অনলাইন সেবা নিরাপদ রাখতে কিছু ব্যবস্থা বন্ধ করেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী দেশটির সরকারি ও প্রকাশ্য ওয়েবসাইটগুলো পিএইচপিতে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজের গবেষকেরা পিএইচপির এসব ত্রুটি শনাক্ত করেন। ‘প্যাচ দ্য প্ল্যানেট’ নামের একটি উদ্যোগের আওতায় ওয়েব উন্নয়নে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষার দুর্বলতা খুঁজে বের করার কাজ করছিলেন তারা। এ কাজে ওপেনএআইয়ের উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়।
ওপেনএআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই আবিষ্কার সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সমস্যাগুলোর একটি। গবেষকদের ধারণা, পিএইচপির এসব ত্রুটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অজানা অবস্থায় ছিল। ফলে এত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবাগুলো নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পিএইচপির ত্রুটির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার ঘটনাটিও ছিল আকস্মিক। পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি মাসের শেষ দিকে ত্রুটির বিস্তারিত তথ্য এবং সমাধানের পদ্ধতি প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তা ত্রুটির তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই বিষয়টি প্রকাশ করতে বাধ্য হয় পিএইচপি ফাউন্ডেশন।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নিরাপত্তা ত্রুটির সুযোগ নিয়ে সাইবার অপরাধীরা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অননুমোদিত প্রবেশ করতে পারে। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি, ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে পিএইচপিনির্ভর ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবার মালিকদের দ্রুত নিজেদের প্রযুক্তিগত কাঠামো পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা প্যাচ দ্রুত সংযোজন এবং প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটের বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহৃত হওয়ায় এই ত্রুটির প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে। ফলে শুধু একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যাংক, সরকারি সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের অনলাইন সেবাই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত করে নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ করা।
