নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। আর নামাজের মধ্যে বান্দার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও প্রিয় অবস্থান হলো সিজদা। সিজদা অর্থ প্রভুর দরবারে সর্বোচ্চ বিনম্রতায় মাথা লুটিয়ে দেওয়া, আত্মসমর্পণ করা এবং চরম আনুগত্য প্রকাশ করা।
শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে বান্দা তার শরীরের সাতটি অঙ্গ মাটিতে লুটিয়ে দিয়ে যে ইবাদত করে, তাকেই সিজদা বলে। সিজদায় গেলে বান্দা মহান আল্লাহর অতি নিকটবর্তী হয়ে যায়। তাই এ সময় খাস মনে দোয়া করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
সিজদায় সাধারণত আমরা যে তাসবিহটি নিয়মিত পড়ে থাকি তা হলো—
আরবি:
سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى
উচ্চারণ: সুবহা-না রব্বিয়াল আ ’লা।
অর্থ: ‘আমার রব্বের পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করছি, যিনি সবার ওপরে।’ (সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজি, সুনানে নাসায়ি)
তবে এই তাসবিহ ছাড়াও প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সিজদায় বিভিন্ন সময় আরও কিছু সুন্দর ও অর্থবহ দোয়া পাঠ করতেন। হাদিসে বর্ণিত সিজদার তেমনই কয়েকটি প্রসিদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ দোয়া নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ক্ষমা ও পবিত্রতা ঘোষণার দোয়া
আরবি:
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: সুবহা-নাকাল্লা-হুম্মা রব্বানা ওয়া বিহামদিকা আল্লা-হুম্মাগফির লী।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাদের প্রভু! আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে মাফ করে দিন।’ (সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজি, সুনানে নাসায়ি)
২. পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের দোয়া
আরবি:
اللَّهُمَّ لَكَ سَجَدْتُ وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، سَجَدَ وَجْهِيَ لِلَّذِي خَلَقَهُ، وَصَوَّرَهُ، وَشَقَّ سَمْعَهُ وَبَصَرَهُ، تَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسنُ الْخَالِقينَ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা লাকা সাজাদতু ওয়াবিকা আ-মানতু ওয়া লাকা আসলামতু। সাজাদা ওয়াজহিয়া লিল্লাযী খালাক্বাহু ওয়া সাওয়্যারাহু ওয়াশাক্কা সাম ’আহু ওয়াবাসারাহু, তাবারাকাল্লাহু আহ্সানুল খালিক্বীন।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্যই সিজদা করেছি, আপনার ওপরই ইমান এনেছি, আপনার কাছেই নিজেকে সঁপে দিয়েছি। আমার মুখমণ্ডল সিজদায় অবনত সেই মহান সত্তার জন্য; যিনি একে সৃষ্টি করেছেন এবং আকৃতি দিয়েছেন, আর তার কান ও চোখ খুলে দিয়েছেন। সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ অত্যন্ত বরকতময়।’ (সহিহ মুসলিম)
৩. সর্বাত্মক ক্ষমার দোয়া
আরবি:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي كُلَّهُ: دِقَّهُ وَجِلَّهُ، وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ، وَعَلاَنِيَّتَهُ وَسِرَّهُ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাগফির লী যাম্বী কুল্লাহু; দিক্কাহু ওয়া জিল্লাহু, ওয়া আউয়ালাহু ওয়া ’আখিরাহু, ওয়া ’আলানিয়্যাতাহু ওয়া সিররাহু।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিন—তার ক্ষুদ্র অংশ, তার বড় অংশ, আগের গুনাহ, পরের গুনাহ, প্রকাশ্য ও গোপন গুনাহ।’ (সহিহ মুসলিম)
৪. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নিরাপত্তার দোয়া
আরবি:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ، وَبِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقوبَتِكَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ، لاَ أُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ، أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নী আঊযুবিরিদ্বা-কা মিন সাখাত্বিকা, ওয়া বিমু ’আ-ফা-তিকা মিন ’উক্বুবাতিকা, ওয়া আঊযু বিকা মিনকা, লা উহ্সী সানা-আন আলাইকা, আনতাকামা আসনাইতা ’আলা নাফসিকা।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার অসন্তুষ্টি থেকে, আর আপনার নিরাপত্তার মাধ্যমে আপনার শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই। আর আমি আপনার কাছে আপনার পাকড়াও থেকে আশ্রয় চাই। আমি আপনার যথাযথ প্রশংসা গণনা করতে সক্ষম নই; আপনি সেরূপই, যেরূপ প্রশংসা আপনি নিজের জন্য করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, সুনানে ইবনে মাজাহ)
৫. ফেরেশতাদের তাসবিহ
আরবি:
سُبوحٌ، قُدُّوسٌ، رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ
উচ্চারণ: সুব্বূহুন কুদ্দূসুন রব্বুল মালা-ইকাতি ওয়াররূহ।
অর্থ: ‘আপনি সম্পূর্ণরূপে দোষ-ত্রুটিমুক্ত, অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত; ফেরেশতাগণ ও রুহের প্রতিপালক।’ (সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ)
৬. অসামান্য ক্ষমতার মহিমা ঘোষণা
আরবি:
سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ، وَالْمَلَكُوتِ، وَالْكِبْرِيَاءِ، وَالْعَظَمَةِ
উচ্চারণ: সুবহা-নাযিল জাবারূতি, ওয়াল মালাকুতি, ওয়াল কিবরিয়া-ই ওয়াল ’আযামাতি।
অর্থ: ‘পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি সেই সত্তার, যিনি প্রবল প্রতাপ, বিশাল সাম্রাজ্য, বিরাট গৌরব-গরিমা এবং অতুলনীয় মহত্ত্বের অধিকারী।’ (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ি)
নামাজের সিজদায় মহান আল্লাহ বান্দার প্রার্থনা সবচেয়ে দ্রুত কবুল করেন। তাই ফরজ নামাজের নির্ধারিত তাসবিহের পাশাপাশি নফল ও সুন্নত নামাজে বা ব্যক্তিগত মোনাজাতে নবীজি (সা.)-এর শেখানো এই সুন্দর দোয়াগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে নিজেদের আকুতি পেশ করা মুমিনের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়।
