সারা দেশে গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৪৪ হাজার ২৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ী অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার ১৮৭ জনকে।
একই সময়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগী হিসেবে ৯ হাজার ৭৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩ হাজার ৪৪৫ জন।
জাতীয় সংসদ ভবনে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা এক প্রতিবেদনে পুলিশের বিশেষ অভিযানের এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অপরাধ দমনে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিবেদনে পুলিশ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বিশেষ অভিযানে অবৈধ অস্ত্রধারী হিসেবে ৭০৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে ছিনতাইকারী, দস্যু ও ডাকাত হিসেবে ৭৯৭ জন এবং কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের হিসাবে, এই ছয় শ্রেণিতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোট সংখ্যা ৪৪ হাজার ২৪৮।
ঢাকা রেঞ্জে গ্রেপ্তার সবচেয়ে বেশি
পুলিশের বিশেষ অভিযানের অঞ্চলভিত্তিক হিসাবও তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, ঢাকা রেঞ্জে তিন মাসে ৮ হাজার ৩৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছে ৫ হাজার ৪১০ জন। ঢাকা রেঞ্জে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগী হিসেবে ২ হাজার ৩৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্রধারী হিসেবে ১০৯ জন, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী হিসেবে ৪১৬ জন, ছিনতাইকারী, দস্যু ও ডাকাত হিসেবে ৫৯ জন এবং কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জে একই সময়ে মোট ৭ হাজার ৩০৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে ৫ হাজার ২১০ জন এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৩২৫ জনকে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৬ হাজার ১৮৯ জন। তাদের মধ্যে চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে ৪ হাজার ২৫১ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া ডিএমপির অভিযানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগী হিসেবে ৮৪৪ জন, অবৈধ অস্ত্রধারী হিসেবে ১১৮ জন, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী হিসেবে ৭২৩ জন এবং ছিনতাইকারী, দস্যু ও ডাকাত হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৫৩ জনকে।
খুলনা রেঞ্জে গত তিন মাসে মোট ৫ হাজার ৩৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে ৩ হাজার ৪৭৪ জনকে গ্রেপ্তার দেখান হয়েছে।
তিন মাসে উদ্ধার ৫৫৭ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র
সংসদীয় কমিটির কার্যপত্রে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের পরিসংখ্যানও রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিন মাসে সারা দেশে ৫৫৭টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬৭২টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৪ হাজার ৫৭৬টি গুলি ও ৪৫৭টি কার্তুজ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব ঘটনায় ৪৫৫টি মামলা হয়েছে; গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬৯৪ জনকে।
মাসভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে ১২০টি, অগাস্টে ১৮৬টি এবং সেপ্টেম্বরে ২৫১টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
মাদকবিরোধী ৪০ হাজার অভিযান
পুলিশের বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রমের অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রথম ১৮০ দিনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৩৫ হাজার অভিযান পরিচালনার লক্ষ্য ছিল। এর বিপরীতে ৪০ হাজার ১৬টি অভিযান পরিচালনা করেছে অধিদপ্তর। এসব অভিযানের পর ১২ হাজার ১৮ জন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে ১২ হাজার ৫৭৭টি মামলা করা হয়েছে।
একই সময়ে দেশের ৬৪ জেলায় অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে ১০০টি অস্থায়ী তল্লাশিচৌকি।
মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অগ্রগতির তথ্যও দেওয়া হয়েছে। প্রথম ১৮০ দিনে ১০ হাজার মাদকাসক্তকে চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৬ হাজার ৬৪৭ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সন্তোষ সংসদীয় কমিটির
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপরাধের হিসাবও পর্যালোচনা করা হয়।
এতে ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্যসংক্রান্ত মামলার তথ্য ছিল।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতির চিত্র উঠে এসেছে। এতে কমিটির সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। বৈঠকে সারা দেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়।
অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করে কমিটি। পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
কমিটির সদস্য নূরুল ইসলাম রাজধানীর সাম্প্রতিক অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চান।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম এবং অগ্রগতি তুলে ধরেন।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, নূরুল ইসলাম ও আব্দুল বাতেন অংশ নেন।
