‘কেঁদো না রিয়াদে নেমেছি, এক-দেড় ঘণ্টা পর বাসায় গিয়ে তোমাকে ফোন দেব।’ সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে স্ত্রী কহিনুর আক্তার কাকলীকে শেষবারের মতো মুঠোফোনে এ কথাই বলেছিলেন
মো. শাহেদ আহম্মেদ। কিন্তু সাহেদের সেই ফোন আর আসেনি। এরপর থেকে ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু স্বামীর কণ্ঠ আর শুনতে পারেননি। স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় থাকা কাকলীকে শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরে এসে সাহেদের নিথর দেহ গ্রহণ করতে হলো। স্বামীকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বাকি জীবন কাটাবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিশাহারা।
সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় নিহত শাহেদের মরদেহ গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। এ সময় স্বামীর মরদেহ সামনে পেয়ে নিজেকে সামলাতে পারেননি কাকলী।
বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে কাকলী বলেন, সৌদি আরবে যাওয়ার আগে থেকেই স্বামীকে নিয়ে তার মনে অজানা ভয় কাজ করছিল। সৌদি আরবে যুদ্ধের পরিস্থিতির কথা ভেবে তিনি শাহেদকে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু স্বামী তার কথা শোনেননি।
কাকলী বলেন, ‘আমি কাঁদছিলাম। সে আমাকে বলেছিল, কেঁদো না। এক-দেড় ঘণ্টা পর বাসায় গিয়ে তোমাকে ফোন দেব। কিন্তু আমার খুব ভয় লাগছিল। যাওয়ার আগে থেকেই কেমন যেন মনে হচ্ছিল। আগে কখনও এমন ভয় লাগেনি। সৌদি আরবে যুদ্ধ হচ্ছে, এই ভেবেই আমি তাকে যেতে দিতে চাইনি। কিন্তু ও জোর করেই চলে গেল।’
শাহেদ ও কাকলীর সংসারে দুই ছেলে— জিহাদ ও কাউসার। জিহাদের বয়স পাঁচ বছর, আর কাউসারের ১০ বছর। বাবার মরদেহ নিতে স্বজনদের সঙ্গে বিমানবন্দরে এসেছিল তারাও। যে বাবাকে ঘিরে ছিল তাদের প্রতিদিনের জীবন, সেই বাবার আর কখনও ফিরে আসা হবে না জিহাদ ও কাউসারের কাছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর ছুটিতে দেশে এসেছিলেন শাহেদ। এক মাস তিন দিন স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কাটিয়ে আবার সৌদি আরবে ফিরে যান তিনি। এরপর ১০ অক্টোবর রিয়াদের বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় প্রাণ হারান বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের এই প্রবাসী। দেশে থাকার সময় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা বাইরে ঘোরাঘুরির চেয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে যেতেন। সেই স্মৃতিগুলোই এখন কাকলীর মনে বারবার ফিরে আসছে।
মাত্র ২৬ বছর বয়সী কাকলী জানান, ১৩ বছর বয়সে শাহেদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দুজনের পছন্দের সম্পর্ক থেকেই তাদের সংসারজীবনের শুরু। দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে হারিয়ে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি তিনি।
কাকলী বলেন, ‘ওদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি চাই, আমার সন্তানদের নিয়ে যেন সারাটা জীবন বেঁচে থাকতে পারি। আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী যেন আমার পাশে দাঁড়ান।’
শাহেদ সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন। তার বৈধ কাজের অনুমতিপত্র বা ইকামা ছিল। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ছুটি কাটিয়ে দেশে থেকে রিয়াদ হয়ে জেদ্দায় কর্মস্থলে ফিরছিলেন তিনি। পথে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় প্রাণ হারান।
এর আগেও দুবার সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শাহেদ। তবে কাজের ব্যবস্থা করতে না পেরে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। প্রায় দুই বছর আগে আবার দেশটিতে গিয়ে প্রথমে শ্বশুরের কাছে থাকেন। পরে শ্বশুরের মাধ্যমে একটি কোম্পানিতে চালকের চাকরি পান। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স জমা দিয়ে ওই চাকরিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে কর্মস্থল পরিবর্তন হলে জেদ্দায় চলে যান তিনি। তার শ্বশুর থেকে যান দাম্মামে।
পরিবারের জন্য জীবিকা নিশ্চিত করতে বিদেশে পাড়ি জমানো শাহেদের এমন করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা। তার মৃত্যুতে স্ত্রী-সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
শাহেদের মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর তা গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পরে তিনি মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারকে আর্থিক সহায়তার চেক দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন প্রতিমন্ত্রী।
গত এক মাসে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাদের একজন শাহেদ, যার মরদেহ গতকাল দেশে এসেছে। অন্যদের মরদেহও দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
