ব্যালন ডি’অর কে জিতবেন, কেইন-ইয়ামাল-মেসি নাকি অন্য কেউ

প্রভাত স্পোর্টস: ব্যালন ডি’অর ঘোষণার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই রোমাঞ্চ বেড়ে চলেছে ফুটবলভক্তদের মনে। সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা বেশ কয়েকজনকে নিয়ে জোর আলাপ উঠলেও, ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বাজারের হিসাবে সমীকরণ উল্টে গেছে। বেশিরভাগ হিসাবেই এগিয়ে রয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখের ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন। তার সঙ্গে মূল লড়াইটা চলছে বার্সেলোনার স্প্যানিশ প্রতিভা লামিনে ইয়ামালের।
বর্তমানে পুরুষদের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে ৩৩ বছর বয়সী কেইনের সম্ভাবনা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ১৯ বছর বয়সী ইয়ামালের ভাগে ২৮ শতাংশ। বাকি সম্ভাবনা কিলিয়ান এমবাপে ও লিওনেল মেসির দিকে ঝুঁকে আছে। ব্যালন ডি’অরের তালিকা প্রকাশের পর থেকে এখন পর্যন্ত সম্ভাবনার পারদটা একেকবার একেক দিকে গিয়েছে। কখনও মেসি-ইয়ামাল তো কখনও এমবাপে-কেইন।
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে এবারের ব্যালন পাওয়ার নিরিখে ফেভারিট ছিলেন সর্বোচ্চ আটবার পুরস্কারটি দখলে রাখা মেসি। কিন্তু ফাইনাল শেষে ইংলিশ অধিনায়ক কেইন এগিয়ে যান, যদিও তার দল বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেনি। আবার তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দেওয়া ইয়ামাল বিশ্বকাপ জিতলেও ফাইনালে গোল-অ্যাসিস্ট কোনোটিই পাননি। মৌসুমজুড়ে দারুণ প্রাণবন্ত এই তারকা একটি গোলও করলে সম্ভবত তিনিই ব্যালন ডি’অর জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার হয়ে উঠতেন।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে ইয়ামাল চারটি শট নিয়েছিলেন, যা ম্যাচে যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু তার কোনো শটই জালে জড়ায়নি। আর তাতেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে হয়তো তাকে বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। যদিও ব্যালন ডি’অর হয়তো সব সময় বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়কে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে না। কখনও আবার করেও! কখনও সমীকরণ বদলে যায় ভোটাভুটিতে।
ব্যালন ডি’অরের বিধিমালার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘লিগ কিংবা জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, বিশ্বের সেরা পুরুষ ও নারী খেলোয়াড়কে ব্যালন ডি’অর পুরস্কার দেওয়া হয়।’ মূলত একজন ফুটবলারের বিগত মৌসুম কেমন গেছে, সে সম্পর্কে কিছুটা নিরপেক্ষ ও সামগ্রিক ধারণা পেতে প্রথমে দেখা যাক ইউরোপিয়ান স্পোর্টস মিডিয়ার (ইএসএম) ‘টিম অব দ্য মান্থ’-এর হিসাব।
১৯৯৫ সাল থেকে একদল সাংবাদিক প্রতি মাসে ইউরোপের সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি একাদশ নির্বাচন করে আসছেন। বিশ্বের শীর্ষ লিগগুলোতে বিভিন্ন পজিশনে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স সম্পর্কে ধারাবাহিক ও ঐতিহাসিক তথ্যভান্ডার তৈরি করেছে এই নির্বাচন। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি ৮৮ বার জায়গা পেয়েছেন মেসি। দ্বিতীয়ত, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (৫১ বার)। আর কোনো খেলোয়াড় ৩৪ বারের বেশি জায়গা পাননি।
বর্তমানে ইউরোপে খেলা ফুটবলারদের মধ্যে নাপোলির কেভিন ডি ব্রুইনা (৩২ বার) চতুর্থ এবং লিভারপুলের ভার্জিল ফন ডাইক (৩০ বার) ষষ্ঠ স্থানে আছেন। ইউরোপে খেলা বর্তমান ফুটবলারদের মধ্যে এই দুজনই ৩০ বারের মাইলফলক ছুঁয়েছেন। এ ছাড়া ২৫ বার মাসসেরা দলে ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের এমবাপে।
তবে গত মৌসুমে টিম অব দ্য মান্থ’-এ সবচেয়ে বেশি জায়গা পাওয়া খেলোয়াড়রা হলেন– কেইন (৮ বার), ডেভিড রায়া (৭ বার), গ্যাব্রিয়েল মাঘালায়েস, ডেকলান রাইস ও মাইকেল ওলিসে প্রত্যেকে ৬ বার করে। এর বাইরে এমবাপে ৫ বার এবং আর্লিং হালান্ড ও আশরাফ হাকিমি ৪ বার জায়গা পান মাসসেরার দলে। মজার বিষয়, গোলরক্ষক রায়া ব্যালনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় নেই।
২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন রানার্সআপ আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি (৫ বার)। ৪ বার ওই পুরস্কার জিতেছেন ইংলিশ তারকা জুড বেলিংহ্যাম। যৌথভাবে ৩ বার করে এমবাপে, হালান্ড ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং কেইন-ইয়ামাল উভয়েই দু’বার করে ম্যাচের নায়ক হয়েছেন। সমান সংখ্যক পুরস্কার পেয়েছেন রোনালদোও।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খেলায় এমভিপি (সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়) নির্বাচন করা হয়। যেখানে বিবেচনায় থাকে ৯০ মিনিটের পারফরম্যান্সের চেয়ে তাদের মোট অবদান। ব্যালন ডি’অরেও এই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে কার গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি– শীর্ষ ১০ খেলোয়াড়ের তালিকায় স্পষ্টভাবে এগিয়ে আছেন দুজন। কেইন এবং এমবাপে।
অপ্টার তথ্যমতে, ইউরোপীয় ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে গত মৌসুমে সর্বোচ্চ ৬৪ গোলে (গোল ও অ্যাসিস্ট) অবদান ছিল বায়ার্ন ও ইংলিশ তারকা কেইনের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬০ গোলে অবদান রাখেন রিয়াল ও ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপে। এরপর যথাক্রমে আছেন ওলিসে (৫২), হালান্ড (৫০), লুইস দিয়াজ (৪১), ইয়ামাল (৩৮), ভিনিসিয়ুস (৩৬) ও উসমান দেম্বেলে (৩৫)।
আরেকটি বিষয় আলোচনায় আছে। গোল ও অ্যাসিস্টের হিসাব দিয়ে সবকিছু বোঝা যায় না। অ্যাসিস্ট আসলে এমন একটি পাস, যেটিকে সতীর্থ গোলে পরিণত করেছেন। আবার সব গোলের মূল্যও সমান নয়। ফলে ‘এডজাস্টেড গোল এবং এক্সপেক্টেড অ্যাসিস্ট’ও দেখা হতে পারে। সেখানে শীর্ষে কেইন (৫১.১৬) ও এমবাপে (৫০.৮৬)। অবশ্য গোল করা ও গোলের সুযোগ তৈরির বাইরে একজন ফুটবলারের দলকে আক্রমণ এগিয়ে নেওয়া, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙা এবং দলের গোল করার সম্ভাবনা বাড়ানোর মতো ‘পজেশন ভ্যালু’ও গুরুত্বপূর্ণ।
সব হিসাব সমন্বয়ের পরও আক্রমণাত্মক অবদানে স্পষ্টভাবে এগিয়ে থাকেন কেইন-এমবাপে। গোল, অ্যাসিস্ট এবং উন্নত পরিসংখ্যানের সমন্বিত বিচারে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে তারা এগিয়ে। তবে ভবিষ্যদ্বাণী বিষয়ক কোনো সমীকরণে একাধিক শিরোপাজয়ী কেইন যতটা আলোচিত, তার ধারেকাছে নেই এমবাপে। বরং দুইয়ে অবস্থান ইয়ামালের। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলা মেসির বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স বিবেচনা করলেও তিনি পিছিয়ে নেই। তবে ব্যালনজয়ী নির্ধারণ কতটা জটিল সেটা বেশ স্পষ্ট!
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০ দেশের ১০০ সাংবাদিককে নিয়ে গঠিত জুরির প্রত্যেক সদস্য যোগ্যতার ক্রমহ্রাসমান হিসেবে ১০ জন খেলোয়াড় বাছাই করেন এবং তাদেরকে ১৫, ১২, ১০, ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ ও ১ পয়েন্ট দেন। সর্বমোট পয়েন্ট পেয়ে যিনি এগিয়ে থাকবেন, তার হাতে উঠবে পুরস্কার। নিয়ম অনুযায়ী, ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে– ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, যার মধ্যে রয়েছে ম্যাচের ফল নির্ধারণে অবদান ও অসামান্য প্রদর্শন, দলীয় নৈপুণ্য ও সাফল্য এবং খেলার মান ও ন্যায্যতা। আগামী সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় লন্ডনে দেওয়া হবে এই পুরস্কার।
More News Of This Category

