কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে তারই আপন ছোট ভাই আলমগীর শিকদার রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার। তার দাবি, হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি হেলাল কারাগার থেকে ফোন করে তাকে জানিয়েছেন, এই হত্যার পরিকল্পনা ও অর্থের জোগান দিয়েছেন আলমগীর। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে একে ষড়যন্ত্রমূলক ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন আলমগীর।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিকেলে মিঠামইন উপজেলার বেড়িবাঁধ এলাকায় জাহাঙ্গীরের বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন তাসলিমা। এ সময় তিনি রিমান্ডে আলমগীরের নাম বলার পর তাকে মারধর ও শরীরে ইনজেকশন দেওয়ার জন্য মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার হোসেনকে দায়ী করেন। তার অভিযোগ, নির্যাতনের কারণেই তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার সময় আলমগীরের নাম উল্লেখ করেননি।
সংবাদ সম্মেলনে তাসলিমা বলেন, বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা খোকাকে গ্রেপ্তারের পর থানায় আনা হলে বাদী হিসেবে তাকে দেখার সুযোগ না দিয়ে আলমগীর শিকদারের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কেন এমনটি করা হলো, তার জবাব চান তিনি। একই সঙ্গে ওসি মনোয়ারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন।
তাসলিমার অভিযোগ, মামলার শুরুতে আলমগীর শিকদারের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছিল। পরে কীভাবে তিনি দেশত্যাগের সুযোগ পেলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মামলাটি মিঠামইন থানা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তরের পর থেকে আলমগীর পলাতক রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
আলমগীরের পাসপোর্ট দ্রুত জব্দ করার দাবি জানিয়ে তাসলিমা বলেন, তাকে দেশত্যাগে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ সহায়তা করে থাকলে, সেটিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
নিহত জাহাঙ্গীর হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করে মৃত্যুর কিছুদিন আগে আলমগীরের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন বলেও জানান তার স্ত্রী। তাসলিমার ভাষ্য, ওই অভিযোগে আলমগীর তাকে হত্যা করতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন জাহাঙ্গীর। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তাসলিমা বলেন, ওই অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সাব্বির। জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের পরদিন তাকে তড়িঘড়ি করে বদলি করা হলো কেন, সে প্রশ্নেরও জবাব চান তিনি। তার দাবি, জাহাঙ্গীরের ভাইবোনেরাও আলমগীরের শাস্তি নিশ্চিত করতে চান।
হত্যাকাণ্ডে বাচ্চু নামে আরেকজনকে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তাসলিমা। তার অভিযোগ, খুনি ভাড়া করা, তাদের লালন-পালন এবং থাকার জন্য বাসা ভাড়া নেওয়াসহ হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে বাচ্চুর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মামলার তদন্তে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে হস্তান্তরের আবেদন করেছেন বলেও জানান তাসলিমা। দ্রুত মামলাটি পিবিআইয়ে স্থানান্তর করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এদিকে জাহাঙ্গীরের বড় বোন নাদিরা পারভীন অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে তারা যেন সোচ্চার না হন, সে জন্য আলমগীর ফোনে ভাইবোনদের হুমকি দিচ্ছেন।
জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল হোতাদের গ্রেপ্তারের দাবিতে শনিবার বিকেলে মিঠামইন সদরে গণমিছিল করেছেন উপজেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মিছিল শেষে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশ থেকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল হোতাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।
নিহত জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আলমগীর শিকদার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তিনি এসব অভিযোগকে ষড়যন্ত্রমূলক ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, কারাগার থেকে হেলাল পরিচয়ে করা কথিত ফোনালাপ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মিঠামইন থানার ওসি মনোয়ার হোসেন। ফোনালাপে প্রকৃতপক্ষে হেলাল ও বাদী ছিলেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি ফোনালাপটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কি না, সে প্রশ্নও তোলেন।
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি মনোয়ার বলেন, মামলাটি বর্তমানে ডিবি তদন্ত করছে।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ফোনালাপের বিষয়টি তাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। তবে বাদীপক্ষের এটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, বিষয়টি পুলিশের অভ্যন্তরীণ এবং তারা তা তদন্ত করে দেখবেন। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হবে। ঘটনায় জড়িত কেউ ছাড় পাবে না বলেও আশ্বাস দেন পুলিশ সুপার।
তবে নিহতের স্ত্রীর করা নির্যাতন, হুমকি ও তদন্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগগুলোর বিষয়ে পৃথক তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
