নাম নয়, মানুষই নামকে মহিমান্বিত করে
শামীমা খানমপ্রকাশ:
“নাম মানুষকে বড় করে না, মানুষই নামকে জাগাইয়া তোলে…” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে মানুষের পরিচয় ও জীবনের গভীর এক সত্য।
প্রতিটি মানুষের জীবন একেকটি আলাদা বই, প্রতিটি পরিবারও যেন স্বতন্ত্র একেকটি গল্প। সেই গল্পের পাতায় থাকে আনন্দ, বেদনা, স্মৃতি, ভালোবাসা আর না বলা অনেক কথা। আজ তেমনই একটি পরিবারের গল্প বলতে চাই। শুরুটা নাম নিয়ে, তবে গল্পের শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে আছে মানুষ, সম্পর্ক ও স্বপ্নের কথা।
১৯৮৩ সাল। একটি শিশুর জন্ম হবে। পারিবারিক আলোচনায় ঠিক হলো, শিশুটির জন্মের সময় নানির সঙ্গে মামা-খালাদের মধ্যে দু-একজনকে নিয়ে যাওয়া হবে তার দাদার বাড়ি ফরিদপুরে। কিন্তু ছোট মামাকে নেওয়া হবে না শুনে অভিমানী হয়ে উঠল অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া সেই কিশোর। বাড়ির সবুজ রঙের দরজা-জানালাজুড়ে লিখে রাখল, ‘ফরিদপুর নিতে হবে’। পরিবারের ছোটদের আবদারও যে কখনো কখনো কত মধুর স্মৃতি হয়ে থাকে, এ ঘটনা তারই একটি উদাহরণ।

শিশুটির নাম রাখা হলো রফিকুল ইসলাম সেরনিয়াবাত শুভ। ডাকনামটি রেখেছিলেন তার এক চাচা। আমরা সাধারণত চাচা বলতে বয়সে বড়, ভারিক্কি স্বভাবের কাউকে কল্পনা করি। কিন্তু শুভর সেই চাচা তখন সম্ভবত নবম কিংবা দশম শ্রেণির ছাত্র। ভাইদের মধ্যে প্রথম সন্তানের নাম ‘শুভ’ রাখার মধ্য দিয়ে যেন শুরু হয়েছিল এক সুন্দর প্রত্যাশার গল্প।
১৯৮৩ সালের ২৬ অক্টোবর ফরিদপুর জেলার কালকিনি থানার বনগ্রামের সন্যামত বাড়িতে জন্ম নেয় শিশুটি। বাড়িটি পরে মওলানা বাড়ি নামে পরিচিত হয়। দাদা মানিক সন্যামত নাতির জন্ম ঘিরে নানা আয়োজন করেছিলেন। পরিবারের সবার মনে ছিল আনন্দ, প্রত্যাশা আর নতুন অতিথিকে ঘিরে অসংখ্য স্বপ্ন।
কিন্তু জীবনের গল্প সব সময় আমাদের ইচ্ছেমতো এগোয় না। কবি কামিনী রায় লিখেছিলেন, “একটুখানি ভুলের তরে অনেক বিপদ ঘটে/ ভুল করেছেন যারা সবাই ভুক্তভোগী বটে।”
শুভর জন্মের সময় প্রয়োজন ছিল অস্ত্রোপচারের। কিন্তু সেই সময়ের জটিলতা ও বিপর্যয় শেষ পর্যন্ত পরিবারের জন্য গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মা রোখসানা খানম বেবী ও বাবা আ. হাকিম সেরনিয়াবাত জিল্লুর তিন পুত্রের মধ্যে বড় সন্তান শুভ একসময় মায়ের কোল শূন্য করে, দুই পরিবারের সবাইকে কাঁদিয়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেয়। তবু ‘শুভ’ নামটি আজও পরিবারের মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। কিছু নাম কেবল পরিচয় হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে ভালোবাসা আর হারানোর বেদনায় মোড়ানো এক অমলিন স্মৃতি।
১৯৯১ সালের ২ জুলাই, ময়মনসিংহের চরপাড়া হাসপাতালে জন্ম নেয় পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্র তারিকুল ইসলাম সেরনিয়াবাত সজল। চাচা-ফুপুরা তাকে ডাকতেন শামীম নামে, আর মামা-খালাদের কাছে সে ছিল সজল। মিষ্টি স্বভাব আর চঞ্চলতায় দুই পরিবারের আদর-স্নেহে বেড়ে উঠতে থাকে সে।
তার আগে রোখসানা খানমের কোলজুড়ে আসে আরেক সন্তান। ১৯৮৭ সালের ১৫ জুন ময়মনসিংহের চরপাড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাতুলালয়ে জন্ম নেয় দ্বিতীয় পুত্র সফিকুল ইসলাম সেরনিয়াবাত। এই পরিবারে নাম রাখার আগে ছোটখাটো মজলিস বসার রেওয়াজ ছিল। বিশেষ করে ডাকনাম নিয়ে চলত নানা আলোচনা। সফিকুল ইসলাম সেরনিয়াবাতের ডাকনাম রাখার সময়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রথমে ‘সাগর’ নামটি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। পরে জানা গেল, আত্মীয়স্বজনদের কারও কারও ছেলের নামও সাগর। শেষ পর্যন্ত মা রোখসানা খানম ছেলের নাম রাখলেন শাওন। এই শাওন ই এই সময়ের অন্যতম নাট্যনির্মাতা সেরনিয়াবাত শাওন।
সম্প্রতি চ্যানেল আই অনলাইনে সেরনিয়াবাত শাওনের নাটক নিয়ে একটি সংবাদ চোখে পড়ল। সংবাদটি পড়তে গিয়ে তার পারিবারিক গল্প ও শৈশবের স্মৃতিগুলোও মনে পড়ে গেল। তাই তাকে নিয়ে দু-চার কথা লেখার ইচ্ছা হলো।

সেরনিয়াবাত শাওন ময়মনসিংহের নজরুল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজের প্রতি তার আগ্রহ তাকে নিয়ে আসে নাট্যজগতে।
তার পরিচালিত প্রথম নাটক ‘লিফলেট’ দিয়েই তরুণ নির্মাতা হিসেবে আলোচনায় আসেন তিনি। এই নাটকের জন্য অর্জন করেন ‘মেরিল-প্রথম আলো’ পুরস্কার। দীর্ঘ বিরতির পর অভিনেত্রী প্রভার অভিনয়জীবনেও ‘লিফলেট’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই নাটকে অভিনয়ের জন্য তিনিও মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার অর্জন করেন।
সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা খায়রুল বাসার সেরনিয়াবাত শাওন পরিচালিত বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছেন। এ ছাড়া স্বাগতা, শ্যামল মাওলা, মামুনুর রশীদ, শিল্পী সরকার অপু, আরশ খান, তাসনুভা তিশা, কেয়া পায়েল, সাদনিয়া ও সাফা কবিরসহ অনেক শিল্পী তার নির্মিত নাটকে অভিনয় করেছেন। দক্ষ অভিনয়শিল্পীদের অংশগ্রহণে এসব নাটকের গল্প পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শাওনের পরিচালিত ‘কাছের কেউ’ ও ‘তোমার ঠিকানায়’ নাটক দুটি দর্শকের কাছে ভালো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। হিয়া এন্টারটেইনমেন্টের ইউটিউব চ্যানেলে তার নাটক প্রচারিত হচ্ছে। পাশাপাশি টেলিভিশন চ্যানেলেও প্রচার হয়েছে তার নির্মিত কাজ।
কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় সেরনিয়াবাত শাওনের উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘যুগল পাখির প্রেম বাগান’, ‘হাত ধরেছি উড়ব বলে’, ‘মন জানালা’, ‘অবুঝ মন’, ‘তালাচাবি’, ‘শেফালি নামে যেই মেয়েটি’, ‘আমাকে দুঃখ দিও না’, ‘সরবত’, ‘আদরে রেখো’ ও ‘ভালোবেসে যাব’।
তার নাটকগুলোতে মানুষের জীবনের নানা দিক উঠে আসে। সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বার্থপরতা, পাশবিকতা ও সংকীর্ণতার পাশাপাশি মানুষের আত্মবিশ্বাস, নির্ভরতা, ত্যাগ, প্রেম ও ভালোবাসার গল্পও তিনি তুলে ধরেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব তার নাটকের গল্পে নানা মাত্রা যোগ করে।
নাটক কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, মানুষের জীবন ও সমাজকে বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। একটি ভালো নাটক দর্শককে হাসাতে পারে, কাঁদাতে পারে, ভাবাতে পারে। কখনো পরিচিত জীবনের অজানা দিক সামনে আনে, কখনো সমাজের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আবার কখনো মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়।
সেরনিয়াবাত শাওনের মতো নির্মাতাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তাদের কাজের মধ্য দিয়ে সমাজের নানা বাস্তবতা আরও গভীরভাবে উঠে আসুক। নাটকের গল্পে মানুষের জীবন, সম্পর্ক, মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গুরুত্ব পাক। দর্শক শুধু নাটক দেখেই যেন থেমে না থাকেন, বরং সেই গল্প থেকে নিজের জীবন ও চারপাশের সমাজকে নতুন করে দেখার সুযোগ পান।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
