কারো প্রেমের সম্পর্ক আছে শুনলেই সমাজের একাংশের মস্তিষ্ক কেন অবধারিতভাবে যৌনতার দিকে ছুটে যায়? কেন প্রেমের খবর অনেকের কাছে দুই মানুষের আত্মিক ঘনিষ্ঠতার বিষয় না হয়ে তাদের শরীরী সম্পর্কের গসিপ হয়ে ওঠে?
তাহলে কি প্রেম সত্যিই যৌনতার লক্ষ্য?
নাকি যৌনতা মানুষের একাকীত্ব অতিক্রমের মানবিক আকাঙ্ক্ষার একটি অংশমাত্র?
এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় বিধবা বা ডিভোর্সী নারীদের ইনবক্সে প্রেমের প্রস্তাবের ঢল নামে। সেখানে “ভালোবাসা” শব্দটি যত্নের ভাষা নয়, প্রবেশাধিকারের কৌশল মাত্র। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়—“বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ”।
এটি কিন্তু নিছক অপরাধের খবর নয়। প্রেমকে ব্যবহার করে শরীর দখলের সামাজিক মনস্তত্ত্বের প্রকাশ। সাহিত্যপাড়াতেও এই প্রবণতা অনুপস্থিত নয়। বন্ধুদের চায়ের আড্ডায় প্রায়ই শোনা যায়
“প্রেমের ফাঁদে” ফেলে যৌনতাকে উপভোগ করার উপভোগ্য গল্প। ফলে কেউ যদি সৎভাবে প্রেমের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চায়, তবে তাকে শুনতে হয় বয়স, পরিপক্বতা কিংবা সামাজিক সতর্কতার ভাষণ। যেন প্রেম মানেই সন্দেহজনক এক শরীরী অভিসন্ধি।
মানুষের সম্পর্কের ইতিহাসে প্রেম ও যৌনতার অভিজ্ঞতা সবসময়ই জটিল ও বহুমাত্রিক। মধ্যযুগে প্রেমকে দেবতার আশীর্বাদ হিসেবে ভাবা হতো। তখন প্রেম ছিল আত্মিক মিলনের একটি পবিত্র পথ। কিন্তু আধুনিক ভোক্তাবাদী সমাজে প্রেমকে ক্রমশ যৌনতার পূর্বাবস্থা হিসেবে এবং যৌনতাকে প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

ফলে “প্রেম মানেই যৌনতা”—এই ধারণা একধরনের সামাজিক সত্যে পরিণত হয়েছে।ফলে এখানে প্রেমকে একটি আবেগগত দুর্ঘটনা কিংবা জৈবিক আকর্ষণের ফল হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু এরিখ ফ্রম প্রেমকে কোনো আকস্মিক আবেগ হিসেবে দেখতে চান না। তিনি প্রেমকে একটি “শিল্প” এবং “অভ্যাসগত মানবিক সক্ষমতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, মানুষ মূলত একাকী ও বিচ্ছিন্ন সত্তা। জন্মের পর থেকেই মানুষ প্রকৃতি, সমাজ এবং অন্য মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা বহন করে। এই অস্তিত্বগত একাকীত্ব কাটিয়ে উঠতেই মানুষ ক্ষমতা, ধর্ম, রাজনীতি, খ্যাতি কিংবা যৌনতার আশ্রয় নেয়।
কিন্তু এই সব পথ তখনই সৃজনশীল হয়ে ওঠে, যখন তার ভেতরে প্রেমের উপস্থিতি থাকে। ফ্রম মনে করেন, প্রকৃত প্রেমই একমাত্র শক্তি যা মানুষকে অন্য মানুষের সঙ্গে গভীর মানবিক বন্ধনে যুক্ত করতে পারে।
ফ্রমের মতে, যৌনতা প্রেমের সমার্থক নয়। তবে যৌনতা কখনো কখনো প্রেমের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি—দুটোকেই আড়াল করতে পারে। আধুনিক মানুষ প্রায়ই যৌনতাকে অন্তরঙ্গতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু কেউ-ই প্রশ্ন করে না—যৌন মিলনের পরেও কেন অনেক মানুষ গভীর নিঃসঙ্গতায় ভোগে, এবং তারা অনবরত সঙ্গী বদল করেও কেন সুখী হতে পারেন না?
এর কারণ শরীরের সাময়িক সংযোগ আত্মার স্থায়ী মিলন নিশ্চিত করে না। যদি সম্পর্ক কেবল যৌন আকর্ষণের ভিত্তিতে তৈরি হয় তা হরে নিশ্চিত থাকুন, আকর্ষণ ফুরিয়ে গেলে সম্পর্কও ভেঙে যাবে। তাহলে কী দাঁড়ালো? দাঁড়ালো এই যে, যৌনতা প্রেমকে প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু প্রেম সৃষ্টি করতে পারে না।
এই কারণেই ফ্রম প্রেমের চারটি মৌলিক উপাদানের কথা বলেন: যত্ন (care), দায়িত্ব (responsibility), শ্রদ্ধা (respect) এবং জ্ঞান (knowledge)। কাউকে ভালোবাসা মানে তাকে ভোগ করা নয়, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। ভালোবাসার মানুষের স্বাধীন অস্তিত্বকে স্বীকার করা, তার চিন্তার বিকাশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি”—এর অর্থ দাঁড়ায়: আমি তোমার ভালো-মন্দসহ তোমাকে গ্রহণ করছি; তোমার স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিকাশে পাশে দাঁড়াচ্ছি। এই অর্থে প্রেম একটি নৈতিক ও সৃজনশীল কর্ম। অর্থাৎ প্রেম অনুভূতির বিষয় না, এটা কাজ।

অন্যদিকে, যৌনতা কেবল শরীরকেন্দ্রিক ভোগে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে তা সাময়িক উত্তেজনা দেয়। কিন্তু গভীর মানবিক মুক্তি দিতে পারে না। তাই ফ্রমের তত্ত্বে প্রেম যৌনতার লক্ষ্য নয়। যৌনতা প্রেমের ভাষা। সত্যিকারের প্রেম থাকলে যৌনতা অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে, প্রেমাষ্পদের দেহ তখন অস্তিত্বগত যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু প্রেমহীন যৌনতা মানুষকে পণ্যভোগী সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেয়। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে শেখায়—যেমন বাজারে পণ্য নির্বাচন করা হয়, তেমনি সম্পর্কও “উপযোগিতা” ও “আকর্ষণ”-এর ভিত্তিতে বেছে নিতে হয়।
ফলে প্রেম ধীরে ধীরে মানবিক সাধনা থেকে বাজারজাত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। আর এই কারণেই যৌনতার চোরাকারবারীরা প্রায়ই সুশীলতার মুখোশ পরে অন্যের চরিত্রহননের আনন্দ উপভোগ করে।
প্রেম এক ধরনের নৈতিক সাহস। অন্য মানুষের সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করার, তাকে জানার, এবং তার স্বাধীন অস্তিত্বকে স্বীকার করার সাহস। এই সাহস হঠাৎ জন্মায় না।
অন্য মানুষের সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করার, তাকে জানার এবং তার স্বাধীন অস্তিত্বকে স্বীকার করার এই সাহস অর্জিত হয় প্রেমের পথে চর্চিত সৃজনশীলতা দিয়ে। যৌনতা হচ্ছে চলতি পথে জিরিয়ে নেওয়ার ছায়া মাত্র।
লেখক : রঞ্জনা বিশ্বাস, সমাজ চিন্তক, লেখক ও গবেষক
