বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এতদিন যে বর্জ্য ও ডাম্পিংয়ের দুর্গন্ধ এক অসহনীয় অভিশাপ হয়ে ঝুলে ছিল, আধুনিক বিজ্ঞানের জাদুকরী ছোঁয়ায় সেই জঞ্জালই এবার রূপ নিতে যাচ্ছে নগরীর নতুন সম্পদে। চট্টগ্রাম বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প (পিপিপি মডেল) এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত দ্বৈত প্রযুক্তির সহায়তায় চট্টগ্রাম শহরের বর্জ্য থেকে উৎপন্ন হবে ৩৬ মেগাওয়াট (±১০%) পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনই হবে দেশের প্রথম সারির বর্জ্য-মুক্ত নগরী এবংএটিই হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার একটি রোল মডেল। এমনটাই প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞদের।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) তথ্য মতে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নাধীন চট্টগ্রাম বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প (পিপিপি মডেল) মেগা প্রকল্পটি সম্প্রতি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) নীতিগত অনুমোদন লাভ করেছে।
‘নো পাওয়ার, নো পেমেন্ট’ মডেলে চুক্তি
স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্য থেকে প্রেরিত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে অনুমোদিত এই প্রকল্পের মূল ভিত্তি হলো অত্যন্ত জনবান্ধব ও ঝুঁকিমুক্ত একটি শর্ত—“বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে কোনো অর্থ প্রদান করা হবে না” (No Power, No Payment)। দীর্ঘ ২০ বছর মেয়াদী এই চুক্তির আওতায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রতিদিনের প্রায় ২,১০০ থেকে ২,৫০০ মেট্রিক টন কঠিন ও পৌর বর্জ্য বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা হবে।
বিশ্বখ্যাত ২ প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রযুক্তি
যুক্তরাজ্যের আধুনিক দ্বৈত প্রযুক্তি বাংলাদেশের মিশ্র ও আর্দ্র পৌর বর্জ্যের প্রকৃত চরিত্রের কথা মাথায় রেখে এই প্রকল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—ডিপি ক্লিনটেক ইউকে লিমিটেড এবং ইমপ্যাক্ট এনার্জি গ্লোবাল লিমিটেড-এর সমন্বিত প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হবে এই প্রকল্পে।
যেভাবে হবে বিদ্যুৎ, সার
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছে, অ্যানারোবিক ডাইজেশন (AD): এই জৈব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নগরীর ভেজা, পচনশীল ও অধিক আর্দ্রতাযুক্ত বর্জ্য থেকে গ্যাস ও জৈব সার উৎপাদন করা হবে।
আরডিএফ কমবাসশন (RDF Combustion): অবশিষ্ট শুকনা ও দাহ্য বর্জ্যগুলোকে ভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করে (Refuse Derived Fuel) বিশেষ তাপীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে পুড়িয়ে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
প্রচলিত শুধুমাত্র বর্জ্য পোড়ানোর (Incineration) পদ্ধতির চেয়ে এই সমন্বিত দর্শন চট্টগ্রামের বর্জ্যের গঠনের সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি সম্পদ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করবে।
জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হবে বিদ্যুৎ
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম নগরীর দৈনন্দিন পৌর বর্জ্য সংগ্রহের পরিমান প্রায় (২,১০০ – ২,৫০০) মেট্রিক টন । এর মধ্যে থেকে প্রকল্পের জন্য ভেজা ও জৈব বর্জ্য অংশ এবং শুকনা ও দাহ্য বর্জ্য অংশ আলাদা করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উৎপাদন করা হবে ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। পরবর্তীতে এই বিদ্যুৎসরাসরি জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়ে লোডশেডিং ও শক্তির ঘাটতি কমাতে ভূমিকা রাখবে।
পরিবেশগত ও নাগরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর স্থলভাগে যত্রতত্র বর্জ্য পচে যে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়, তা মারাত্মক গ্রিনহাউস ইফেক্ট তৈরি করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এই মিথেন ও কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, একই সাথে উন্মুক্ত স্থানে ময়লার স্তূপ না থাকায় মশা-মাছি ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপদ্রব কমবে, ফলে নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
শতাধিক কর্মসংস্থান
বিশ্বমানের প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চ শিক্ষিত তরুন তরুনীরা আধুনিক গ্রিন টেকনোলজি ও প্ল্যান্ট পরিচালনার সুবাদে চট্টগ্রামে শত শত নতুন ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়নের হলে এটি বায়ুমণ্ডলের কার্বন নিঃসরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে প্রকল্পটির প্রতিটি ধাপে সঠিক তদারকি, কঠোর আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতার সাথে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে নিরাপদ পরিবেশবান্ধব প্ল্যান্টের পাশাপাশি দেশের প্রথম সারির বর্জ্য-মুক্ত নগরী এবং এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি 'মডেল উইন্ডো' বা রোল মডেল হয়ে দাঁড়াবে।
একই সাথে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় দুই প্রতিষ্ঠানের এত বড় যৌথ নিরাপদ বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসার অর্থই হলো—এ দেশের সবুজ অর্থনীতি ও পিপিপি কাঠামোর ওপর আন্তর্জাতিক আস্থার সুদৃঢ় প্রকাশ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরকে ক্লিন এবং গ্রিন রাখার লক্ষ্যে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে ইউকের সাথে আরেফিন নগরে প্রকল্পের জন্য চুক্তি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এই মেগা উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, টেকসই ও পরিচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ গড়তে আমাদের সদিচ্ছা এবং সক্ষমতা—দুটিই রয়েছে। আমরা চাটগাঁবাসীকে শুধু একটি শহর দিচ্ছি না, একটি সবুজ, প্রাণবন্ত ও বিশ্বমানের বাসযোগ্য আবাস উপহার দিচ্ছি।
মেয়র আক্ষেপ করে বলেন, আমি মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে ১০টি দেশের সাথে কথা বলেছি।এই প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে জমা দিয়েছিলাম। তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ফাইলটি অফিস থেকে বাসায় নিয়ে রেখে বিভিন্ন সময়ে দিয়েছেন অনৈতিক আবদার। তা রক্ষা করতে না পারাতেই প্রকল্পের কাজ এতোটা দিন পিছিয়ে গেছে। আমরা মনে করেছিলাম জুলাই আগষ্ট বিপ্লবের পরে যাদের মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে। পরবর্তীতে তারাই সবচেয়ে বেশী দুর্নীতিবাজে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ আজ রূপান্তরের যে সোনালী অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, তারই এক উজ্জ্বল মাইলফলক হবে চট্টগ্রামের এই বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পটি। নগরীকে ক্লিন এবং গ্রীন রাখার জন্য বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে এর কোন বিকল্প নেই। যে জঞ্জাল আর দুর্গন্ধ এতদিন আমাদের নাগরিক জীবনের গ্লানি ছিল, আগামীতে তা-ই হবে নগরবাসীর ঘরের আলোর উৎস।
