মসনদে আলা ঈসাখাঁর স্মৃতি বিজড়িত কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যের বিখ্যাত নানা দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
আহসানুল হক জুয়েল, নিকলী কিশোরগঞ্জ
মসনদে আলা ঈসাখাঁর স্মৃতি বিজড়িত কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যের বিখ্যাত নানা দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পাগলা মসজিদ বর্তমানে দেশ-বিদেশে ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনা হিসেবে ইতোমধ্যে খ্যাতিলাভ করেছে। দেশ-বিদেশের বহু দর্শনার্থী প্রতিদিন এই মসজিদটি দেখতে আসেন। পাগলা মসজিদটি শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছেই নয়, সকল ধর্মাবলম্বীদের নিকট অত্যন্ত পবিত্র ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
গত ১০ আগস্ট ২০২৫ অন্তবর্তী কালীন সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন এই মসজিদটি পরিদর্শন করেন এবং তিনি তখন বলেন, খুব শিগগিরই পাগলা মসজিদের দৃষ্টিনন্দন ১০ তলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হবে। আধুনিক তুরস্কের নকশায় বহুমুখী কার্যক্রমের উপযোগী ইসলামিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের মধ্যেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে।
তিনি আরও জানান, পাগলা মসজিদের ৯০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বর্তমানে ১৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এফডিআর হিসেবে রাখা আছে, যার লভ্যাংশ গরিব, অসহায়, অনাথ ও অসুস্থদের জন্য ব্যয় করা হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কাল চলে গেল ২০২৬ সালে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো ৩ মাস পর পর পাগলা মসজিদে কোটি কোটি টাকা অনুদান আসলেও আধুনিক মসজিদ নির্মাণের কোন সম্ভাবনা দেখছেনা স্থানীয়রা।
মসজিদ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
মসনদে আলা ঈসাখাঁর বংশধরদের বাসস্থান কিশোরগঞ্জ শহরের হয়বতনগর এলাকার দেওয়ান বাড়ি। দেওয়ান হয়বত খান হয়বতনগর দেওয়ান বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। দেওয়ান হয়বত খানের নাম অনুসারে শহরের একটি অংশের নামকরণ করা হয়েছে হয়বত নগর। হয়বতনগর দেওয়ান বাড়ির দেওয়ানদের তথ্যমতে, কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের হয়বতনগর এলাকার প্রতিষ্ঠাতা দেওয়ান হয়বত খানের অধীনস্ত নবম পুরুষ দেওয়ান জোলকদর খান ছিলেন সুফীসাধক। তার কামেলিয়াতের খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তার সাথে দেখা করতে বিভিন্ন অঞ্চল হতে মানুষ আসা শুরু হয়। তখন মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব হয়। দেওয়ান জোলকদর খান একদিন স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে দেওয়ানবাড়ির অদূরে উত্তর দিকে জেলা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহাসিক নরসুন্দা নদীর তীরে এই পাগলা মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।
পাগলা মসজিদ নামকরণ কিভাবে হয়?
স্থানীয় এলাকাবাসী ও বিভিন্ন অঞ্চল হতে দেখা করতে আসা মানুষ গুলো জোলকদর খানকে (আল্লাহর দেওয়ানা) পাগলা বলে ডাকতো। এই আল্লাহ পাগল মানুষের দ্বারা এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে এলাকার মানুষেরা মুখেমুখে এই মসজিদকে পাগলা মসজিদ নামে ডাকে। পরবর্তী সময়ে এই নামে মসজিদটি খ্যাতিলাভ করে।
বর্তমান ও পূর্বের মসজিদের বিবরণ
কিশোরগঞ্জে পাগলা মসজিদ প্রতিষ্ঠার সময় মসজিদের ভূমির পরিমাণ ১০ শতাংশ থাকলেও, এখন তা সম্প্রসারিত হয়ে এর মোট ভুমির পরিমাণ প্রায় ৫ একর ৫০ শতাংশ। কর্তৃপক্ষ বলছেন এই মসজিদের জন্য আরো জায়গা ক্রয় করা হবে।
বর্তমানে তিন তলা বিশিষ্ট পাগলা মসজিদের ছাদে তিনটি বড় সবুজ গম্বুজ এবং ৫ তলা ভবনের সমান একটি সুউচ্চ মিনার রয়েছে। মসজিদটির ধারণক্ষমতা সহ¯্রাধিক
পাগলা মসজিদের ইমরাত খুবই সুন্দর এবং নির্মাণশৈলীও বেশ চমৎকার। আধুনিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত পাগলা মসজিদটি ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনা হিসেবে খ্যাত। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ শহরের লেকসিটি প্রকল্পের আওতায় পাগলা মসজিদের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদী খনন, দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ, মসজিদের শোভাবর্ধন এবং রঙিন আলোকসজ্জার জন্য দিনে ও রাতে মসজিদটি দেখতে চমৎকার লাগে। দেশের দূরদূরান্ত থেকে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ মসজিদটি দেখতে ভিড় জমান,নারী-পুরুষেরা নামাজ আদায় করেন, মসজিদে টাকা পয়সা স্বর্ণ অলংকার হাঁস-মুরগি গরু ছাগল ইত্যাদি দান করেন। অনেক দর্শণার্থী মানতের অর্থ দান করেন। বিশেষত জুমার নামাজের সময় প্রচুর পরিমাণে মানুষের সমাগমে মসজিদ পরিপূর্ণ হয়ে আশপাশের রাস্তাঘাট এবং মাঠ পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
এ মসজিদে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও নামাজ আদায়ের সুব্যবস্থা রয়েছে। নারীরা মসজিদের পৃথক স্থানে নামাজ আদায় করে থাকেন। মসজিদে যারা আসেন সবাই দু’হাত খুলে দান করেন। শুধু মুসলমান নয়, অন্যান্য ধর্মের লোকজনকেও এ মসজিদে দান করতে দেখা যায়। এই পাগলা মসজিদটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বিত্তশালী মসজিদ এ পরিণত হয়েছে। ৩-৪ মাস পর পর দান বাক্স খোলা হলে বৈদেশিক মুদ্রাসহ কোটি কোটি টাকা অনুদান পাওয়া যাচ্ছে। যা ইতিমধ্যেই দেশের সকল গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
পাগলা মসজিদে কারা দেন এসব টাকা পয়সা
প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে প্রচুর লোক সমাগম হয়। সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় জুম্মার দিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বেশি বেশি দান খয়রাত করে থাকে এবং জুমার নামাজ আদায় করতে আসে এছাড়াও প্রতিদিনই মানুষ আসে, দান করার দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রতি তিন মাস পর পর খোলা হয় এই মসজিদের ১১টি লোহার দানসিন্ধুক। মসজিদের দানসিন্ধুকগুলো খুলতেই দেখা যায় শুধু টাকা আর টাকা। এসব টাকা বস্তায় ভরে নেয়া হয় ঐ মসজিদের দোতলায়। পরে, মসজিদের মেঝেতে বসে দিনব্যাপী টাকা গণনার কাজে অংশ নেয় মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, মসজিদ কমপ্লেক্সে অবস্থিত মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পার্শ্ববর্তী জামিয়াতুল এমদাদিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মাচারীসহ চার শতাধিক মানুষের একটি দল। এসময় উপস্থিতি থাকেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও পুলিশ সুপার সহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
দান বাক্সে টাকা কি হয় ?
ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সের টাকা গণনা শেষে মসজিদের ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা রাখতে সম্পূর্ণ পুলিশি নিরাপত্তায় দানের সব টাকা নিয়ে যাওয়া হয় ব্যাংকে। এছাড়াও মসাজিদে মানতের বিভিন্ন দানসামগ্রী প্রতিদিন আসরের নামাজের পর প্রকাশ্য নিলাম ডাকের মাধমে বিক্রয় করে প্রাপ্ত অর্থ পরদিন ব্যাংক আওয়ারে মসজিদের হিসাব নম্বরে জমা রাখা হয়। যা পরে প্রতিমাসে ব্যয় করা হয় কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও মসজিদের বিভিন্ন রক্ষনাবেক্ষণের কাজে।
পাগলা মসজিদের টাকায় ২০০০ সালে মসজিদের পাশেই একটি হাফেজিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্তমানে এই মাদরাসায় ১৩০ জন এতিম শিশু পড়াশোনা করছে। মসজিদের টাকায় তাদের যাবতীয় ভরণপোষণ করা হয়ে থাকে। মসজিদের ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা রাখা দানের টাকা থেকে আসা লভ্যাংশ ব্যয় করা হয়, দুস্থ ও দূরারোগ্য রোগীদের মাঝে। এছাড়া মসজিদের মূল তহবিলের টাকা এখন আর কোথাও ব্যয় করা হচ্ছেনা বলেই জানিয়েছেন মসজিদ কর্তৃপক্ষ। প্রতি অর্থবছর ওয়াকফ স্টেটের অডিটর দ্বারা মসজিদের আয়-ব্যয়ের অডিট করা হয়। সবশেষ মসজিদের দানসিন্ধুক খুলে রের্কড পরিমান টাকা পাওয়া যায়। যা অন্যান্যবারের সকল রের্কড ভেঙ্গে তৈরি করেছে নতুন রের্কড। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৭ জুন শনিবার গণনা শেষে ১৫ কোটি ৯০ লক্ষ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা পাওয়া যায়। যা পাগলা মসজিদের সকল অতীতের রের্কড ছাড়িয়েছে।
পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতি বক্তব্য
সম্প্রতি (২৭ জুন) শনিবার পাগলা মসজিদের টাকা গণনার কাজ চলার সময় সাংবাদিকদের জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন। বলেন, পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের খরচ চালিয়ে দানের বাকি টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়। এ পর্যন্ত সরাসরি দানের ১১৪ কোটি টাকা ও অনলাইনে দানের ২৪ লক্ষ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা ব্যাংকে জমা আছে। এছাড়া মসজিদে দান করা বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে রাখা আছে।
জেলা প্রশাসক জানান, ব্যাংকে জমা টাকার লভ্যাংশ থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্তদের সহায়তা করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা:
হারুয়া এবং শিক্ষক পল্লী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা এই প্রতিবেদককে বলেন আমরা শুনেছি মসজিদের দানের টাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি দৃষ্টিনন্দন ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। যেটি এশিয়া মহাদেশের মধ্যে অন্যতম স্থাপত্য হিসেবে নির্মিত হবে। এজন্য আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ থেকে ১২০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মানের এ কমপ্লেক্সটি নির্মিত হলে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। সেই সাথে ৫ হাজার নারীর নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থাসহ মুসুল্লিদের ২০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। তারা আরো বলেন, কোটি কোটি টাকা মসজিদে অনুদান আসছে অথচ আধুনিক মসজিদ নির্মাণের কোন প্রকার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। আমরা আশাবাদী মসজিদ কমিটি খুব দ্রুতই আধুনিক মসজিদের কাজ শুরু করবেন।
পাগলা মসজিদের দান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
এ মসজিদে দান করলে মনোবাঞ্ছনা পূরণ হয়, এই বিশ্বাস থেকেই মানত মানা হয়। মানতের দান সম্পর্কে কিছু কিছু ইসলামী চিন্তাবিদ ও সচেতন আলেমসমাজ মনে করেন, এই ধরনের বিশ্বাস ও চিন্তা কুসংস্কারের অংশ ও সম্পূর্ণ শরিয়তবিরোধী। শুধুমাত্র পাগলা মসজিদ নয়,পৃথিবীর কোন মসজিদেই মানতের টাকা দান করার কোন সুযোগ নেই। মানতের টাকার হকদার এতিমরা, সমাজের অবহেলিত গরিব অসহায় মানুষগণ, মসজিদ নয়। মানতের টাকা মসজিদে কোনভাবেই ব্যবহার করা যাবে না।
পাগলা মসজিদের ওয়েবসাইট উদ্বোধন
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্স-এর ওয়েবসাইট ও অনলাইন ডোনেশন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।
দেশ-বিদেশ থেকে ঘরে বসেই কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদে দান করা যাবে।ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাগলা মসজিদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, নামাজের সময়সহ বিভিন্ন তথ্য জানা যাবে।
গত ৪ জুলাই ২০২৫ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের সভাপতি কিশোরগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক (যুগ্মসচিব) ফৌজিয়া খান মসজিদ প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে পাগলা মসজিদের ওয়েবসাইট উদ্বোধন করেন। ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ওয়েবসাইটের ঠিকানা (www.paglamosque.org)
