সাহিত্যের জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় লেখা বইয়ের জন্য নতুন সাহিত্য পুরস্কার চালু হয়েছে ফ্রান্সে। ‘প্রি পাসকাল দে লিতারেত্যুর ইয়া’ নামের এ পুরস্কারের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়া যাবে। বিজয়ী পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার শব্দের মধ্যে ফরাসি ভাষায় লেখা অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি জমা দিতে হবে। বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে লেখকেরা এতে অংশ নিতে পারবেন। তবে পাণ্ডুলিপি তৈরিতে কোন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল ব্যবহার করা হয়েছে এবং কী ধরনের নির্দেশনা বা প্রম্পট দেওয়া হয়েছিল, সে তথ্যও জমা দিতে হবে।
চ্যাটজিপিটি, ক্লড, জেমিনাই ও লামাসহ বিভিন্ন বৃহৎ ভাষা মডেল ব্যবহার করে লেখা তৈরির অনুমতি রয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতায় শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তৈরি মডেলের ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি।
সপ্তদশ শতকের ফরাসি গণিতবিদ, পদার্থবিদ ও দার্শনিক ব্লেজ পাসকালের নাম অনুসারে পুরস্কারটির নাম রাখা হয়েছে। যান্ত্রিক গণনাযন্ত্রের প্রাথমিক বিকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনবিষয়ক রচনার জন্যও তিনি পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পঁসে’তে দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে।
প্রতিযোগিতার শর্তে কল্পকাহিনিমূলক পাণ্ডুলিপি চাওয়া হলেও লেখার বিষয়বস্তুতে মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন নৈতিক, সামাজিক কিংবা পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে সহায়ক হওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, কেবল সাহিত্যিক গুণ নয়, সমসাময়িক মানবিক সংকট মোকাবিলায় লেখার সম্ভাব্য অবদানও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ: ‘প্রি পাসকাল’ পুরস্কারটি যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফিলিপ রদ্রিগেজ, আলবাঁ সেরভিয়ঁ ও জিল সাঁত্রে।
রদ্রিগেজ একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ বিষয়ে পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ‘আভোল্টা’র প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে তাঁকে ইউরোপের ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইন শিল্পের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আলবাঁ সেরভিয়ঁ ডিজিটাল গণমাধ্যমের উদ্যোক্তা এবং এলজিবিটিকিউ+ বিষয়ক সাময়িকী ‘তেতু’র সাবেক চেয়ারম্যান। অন্যদিকে, দর্শনশাস্ত্রে পিএইচডিধারী জিল সাঁত্রে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও প্যারিসের পান্তেওন-সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। অনলাইনে ভোট গ্রহণের প্ল্যাটফর্ম ‘এলেক্তিস’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতাও তিনি।
সাহিত্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক: এ বছর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাহিত্য পুরস্কারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের পর নতুন এ পুরস্কার চালু হলো। কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজ, কেইন প্রাইজ এবং ফ্রান্সের মর্যাদাপূর্ণ গনকুর পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকায় থাকা কিংবা বিজয়ী লেখা তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা নিয়ে গত কয়েক মাসে আলোচনা হয়েছে।
প্রযুক্তির সহায়তায় সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে লেখকের নিজস্ব সৃজনশীলতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবদান এবং মৌলিকত্ব নির্ধারণের প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নতুন পুরস্কারটি সেই বিতর্কের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি সাহিত্যকর্মকে স্বতন্ত্রভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করছে।
গত মঙ্গলবার থেকে ‘প্রি পাসকাল’ পুরস্কারের জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। আয়োজকদের নির্ধারিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়া যাবে। এরপর ১০টি পাণ্ডুলিপি নিয়ে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হবে এবং ডিসেম্বরের শুরুতে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।
পাঁচ থেকে ছয়জন লেখক, সাহিত্য সমালোচক, সাংবাদিক, দার্শনিক ও প্রকাশককে নিয়ে বিচারকমণ্ডলী গঠন করা হবে। আগামী নভেম্বরের শুরুতে বিচারকদের নাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সানা/ডিসি/আপ্র/২৫/১০/২০২৬
