খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একবার ছানির অস্ত্রোপচার করালেও চোখের সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি ফজিলা খাতুনের।
চিকিৎসকের পরামর্শে এবার ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আনা হয়েছে তাকে। এখান থেকে জানানো হয়েছে, অস্ত্রোপচারের ‘সিরিয়াল’ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হতে পারে।
মেয়ে ফজিলা খাতুনকে নিয়ে মঙ্গলবার ঢাকায় আসেন সিরাজুল ইসলাম; উঠেছেন হেমায়েতপুরে এক আত্মীয়ের বাসায়। সেখান থেকেই হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে তাদের।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আসন ফাঁকা নেই, তাই ভর্তি নিচ্ছে না। আবার টাকা খরচ করে বেসরকারি কোথাও গিয়ে অস্ত্রোপচার করানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই অপেক্ষা করছি, দেখি কবে তারিখ পাওয়া যায়।’’
বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে কথা হয় সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিসহ অন্তত ১০ রোগী ও স্বজন চিকিৎসা পেতে দীর্ঘসূত্রতার কথা বলেছেন।
এক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের তারিখ পেতে সবচেয়ে বেশি সময় অপেক্ষায় থাকতে হয় বলে তাদের ভাষ্য।
বৃহস্পতিবার ২৫০ শয্যার এ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি কক্ষের সামনেই রোগী ও স্বজনদের ভিড়।
বহির্বিভাগ, স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন বিতরণ, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট সেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ কক্ষের সামনে লম্বা লাইন।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসকসহ বর্তমানে যে পরিমাণ লোকবল রয়েছে, তা দিয়ে এত মানুষের সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে ভাষ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।
প্রতিদিন সিএফপি পরীক্ষা মাত্র ৩০ জনের
চোখের সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা হলো সিএফপি। এর মাধ্যমে চোখের রেটিনা ও অপটিক নার্ভের ছবি তোলা হয়। এই পরীক্ষায় রেটিনার অবস্থা, অপটিক ডিস্ক, রক্তনালির পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে ধারণা পান চিকিৎসকরা।
দিনে সর্বোচ্চ ৩০ জনের পরীক্ষার বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক রেজওয়ানুর রহমান সোহেল বলেন, “সিএফপি পরীক্ষার জন্য আমাদের এখানে তিনটি যন্ত্র আছে। কিন্তু কয়েক মাস আগে দুটো যন্ত্র বিকল হয়ে পড়ে। সেগুলোর ত্রুটি ঠিক করতে অনেক সময় লাগে।
“কয়েক মাস এই পরীক্ষা না হওয়ায় অনেক রোগীর জট পড়েছে। তাদের বিভিন্ন তারিখ দেওয়া হয়েছিল; ফলে পুরনো রোগী এবং নতুনদের মধ্য থেকে ৩০ জন করে সুযোগ পাচ্ছেন।”
ছানি অপারেশনের চাপ
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ছানি অপারেশন হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেকেই আসেন জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতালে।
মেয়েকে নিয়ে অস্ত্রোপচার করাতে এসেছেন আসমা বেগম নামে এক গৃহিণী।
তিনি বলেন, ‘‘মেয়ের জন্মের পর থেকে চোখের ছানির সমস্যা। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছিলেন চশমা ব্যবহার করতে। কিন্তু ছোট মানুষ, তাই সেভাবে চশমা ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া যায়নি।
‘‘এতে চোখের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। এখানকার চিকিৎসকরা অপারেশনের কথা বলছেন, কিন্তু অপারেশনের সময় পেতে আরও ১৫ দিন লাগবে।”
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক রেজওয়ানুর রহমান সোহেল বলেন, “আমরা বিনামূল্যে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০ জনের ছানি অপারেশন করি। এখানে অপারেশন থিয়েটারের যে সক্ষমতা, তাতে এর বেশি করা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানে এই সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী আসেন।”
তিনি বলেন, ‘‘আমরা সক্ষমতার সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করছি। দেশের বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালে, আবার কিছু বিশেষায়িত হাসপাতালেও ছানি অপারেশন হয়। এটি জটিল কোনো বিষয়ও নয়, তবে মানুষজন এ হাসপাতালে ছুটে আসে। এতে আমরা চাপের মধ্যে পড়ি, আবার রোগীদের সেবা পেতে দেরি হয়।’’
সহকারী পরিচালক আরও বলেন, ‘‘স্বাভাবিক ছানি অপারেশনের জন্য দেশের অঞ্চলভিত্তিক হাসপাতালের ওপর নির্ভর হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি আমরা।’’
সকাল থেকেই রোগীদের ভিড়
বিশেষায়িত এই হাসপাতালে খুব সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ভিড় করেন। রোগীদের স্বার্থে সকাল ৮টার আগেই বহির্বিভাগের সব টিকিট কাউন্টার চালু করা হয় বলে জানান চিকিৎসকরা।
কিশোরগঞ্জ থেকে আসা মামুন বলেন, ‘‘আমি অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলাম। ডাক্তার দেখানোর পর আমাকে অন্য বিভাগে রেফার করেছেন, সেখানকার ৪৫ নম্বর সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছি।’’
ময়মনসিংহ থেকে আব্দুল আজিজকে নিয়ে এসেছেন ছেলে জুলফিকার আলী।
তিনি বলেন, ‘‘আমার বাবা সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে চোখে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন। আগের দিন ঢাকায় এসেছিলাম। সকাল ৮টায় হাসপাতালে আসি। ১টায় একজন চিকিৎসক দেখিয়েছি। তিনি কয়েকটা পরীক্ষা করাতে দিয়েছেন।
“এসব রিপোর্ট করানোর সিরিয়াল এখনো পাইনি। আজ টাকা জমার সময় শেষ। কাল টাকা জমার পর জানা যাবে সিরিয়াল কবে পাব।’’
রেজওয়ানুর রহমান সোহেল বলেন, ‘‘এই হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগী আসেন, তাতে আরও অনেক মেশিন, যন্ত্রপাতি এবং চিকিৎসক প্রয়োজন। আমরা ২৫০ থেকে ৫০০ শয্যা করার একটি দাবি জানিয়েছি মন্ত্রণালয়ে। সেটার ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে বলে জেনেছি। এই প্রকল্প পাস হলে আরও অনেক মানুষ সেবা পাবেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘এই হাসপাতালের টিকেটের মেয়াদ এক বছর থাকে, এমনকি টিকেটের মধ্যে ফাঁকা জায়গা থাকা পর্যন্ত ডাক্তাররা পরামর্শ লেখেন। আবার আমরা অল্প জনবল নিয়েও কোনো রোগীকে ফেরত পাঠাই না।”
