পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিকে তিনি মূলত মানুষের সেবা ও কল্যাণের জন্য অনুগত (তাশখীর) করে দিয়েছেন।
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
মহাবিশ্বের বিশাল আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, নদী-সাগর থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ—সবকিছুর সৃষ্টি ও জীবনচক্রের মাঝে এক পরম কুশলী সৃষ্টিকর্তার মহাপরিকল্পনা লুকিয়ে রয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন- “আমি আকাশ ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি, যদিও কাফিরদের ধারণা তাই। সুতরাং কাফিরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ। (আস সোয়াদ: ২৭)
তিনি আরও জানিয়েছেন -পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিকে তিনি মূলত মানুষের সেবা ও কল্যাণের জন্য অনুগত (তাশখীর) করে দিয়েছেন।
প্রকৃতির এই চিরন্তন সত্য ও ঐশ্বরিক অনুগতকরণের সবচেয়ে জীবন্ত এবং বিস্ময়কর নিদর্শন হলো একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ—মৌমাছি। মৌমাছির নিখুঁত জীবনধারা, সমাজ ব্যবস্থা এবং মধু উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় মানুষের জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। পবিত্র কুরআনের ১৬ নম্বর সূরার নাম ‘আন-নাহল’ যার আভিধানিক অর্থ ‘মৌমাছি’। এই সূরার ৬৮ ও ৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মৌমাছির সৃষ্টি রহস্য তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলেন: "আর তোমার প্রতিপালক মৌমাছির প্রতি ইলহাম (অন্তরে ইঙ্গিত দ্বারা নির্দেশ প্রদান) করেছেন যে, পাহাড়ে, বৃক্ষে আর উঁচু চালে বাসা তৈরি কর। অতঃপর প্রত্যেক ফল থেকে আহার কর এবং তোমার পালনকর্তার সহজ পথ অনুসরণ কর...”
এখানে ব্যবহৃত ‘ইলহাম’ বা ‘ইঙ্গিত’ শব্দটির অর্থ হলো জন্মগত প্রবৃত্তি। আল্লাহ মৌমাছির ভেতরে এমন এক স্বয়ংক্রিয় জ্যামিতিক ও প্রকৌশলগত জ্ঞান স্থাপন করেছেন, যার কারণে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তারা মোম দিয়ে নিখুঁত ছয় কোণাবিশিষ্ট প্রকোষ্ঠের চাক তৈরি করতে পারে। মাইলের পর মাইল দূরে উড়ে গিয়েও তারা ঠিক পথ চিনে নিজের চাকে ফিরে আসে, কারণ আল্লাহ তাদের জন্য যাতায়াতের পথকে অত্যন্ত সহজ ও সুগম করে দিয়েছেন।
সূরা আন-নাহলের ৬৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মৌমাছির পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় (মধু) নির্গত হয়, যা মানুষের জন্য আরোগ্য (শিফা) স্বরূপ। ফুলের রস ও পরাগরেণুর ভিন্নতার কারণে মধুর রঙও আলাদা হয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং রাসায়নিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মধুতে রয়েছে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান এবং শক্তিদায়ক গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ, যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। কুরআনে এই মধুকে ‘মৌমাছির জন্য আরোগ্য’ বলা হয়নি, বলা হয়েছে ‘মানুষের জন্য আরোগ্য’ (ফিহি শিফাউন লিন্নাস), যা প্রমাণ করে এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত মানুষের সেবায় নিয়োজিত।
মৌমাছির জীবনধারা পর্যবেক্ষণ করলে এক পরম বিস্ময় জাগ্রত হয়। জীববিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাণী কেবল নিজের বেঁচে থাকা এবং বংশবৃদ্ধির জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই শক্তি ও শ্রম ব্যয় করে। কিন্তু মৌমাছি এর এক বিরাট ব্যতিক্রম। একটি কর্মী মৌমাছি তার পুরো জীবনে মাত্র এক চা-চামচের ১২ ভাগের ১ ভাগ মধু তৈরি করতে পারে। আর মাত্র এক পাউন্ড মধু তৈরি করতে মৌমাছিদের প্রায় ২০ লক্ষ ফুলে বসতে হয় এবং প্রায় ৫৫,০০০ মাইল পথ উড়তে হয়। এই তীব্র হাড়ভাঙা খাটুনির পর তৈরি হওয়া মধুর সিংহভাগই তারা নিজেদের জন্য ব্যবহার করতে পারে না। মানুষেরা তা চাক থেকে সংগ্রহ করে নেয়। যদিও তারা শীতকালের জন্য এই খাদ্য জমা করে, কিন্তু আল্লাহ তাদের প্রবৃত্তিতে এমন এক প্রাচুর্য ও দূরদর্শিতা দিয়েছেন যে, তারা প্রয়োজনের চেয়ে বহুগুণ বেশি মধু উৎপাদন করে। নিজেরা তা পুরোপুরি ভোগ না করে মানুষের জন্য রেখে যায়। মৌমাছির এই স্বভাবটি প্রমাণ করে যে, তাদের এই প্রোগ্রামিং বা আচরণ স্বয়ংক্রিয় নয়, বরং আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে এমন একটি সফটওয়্যার বা প্রবৃত্তি (ইলহাম) সেট করে দিয়েছেন, যা অবচেতনভাবেই মানবজাতির সেবায় নিয়োজিত।
অনেকে মনে করতে পারেন, মৌমাছিরা শুধু মানুষের জন্যই মধু বানায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য হলো, মৌমাছিরা মূলত শীতকালের জন্য বা প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য এই খাদ্য জমা করে, যখন প্রকৃতিতে কোনো ফুল থাকে না।
আল্লাহ মৌমাছিকে এমন এক দূরদর্শিতা ও সঞ্চয়ের প্রবৃত্তি দিয়েছেন, যা অনেক পশুরও নেই। তারা জানে কীভাবে মোম দিয়ে নিখুঁত জ্যামিতিক প্রকোষ্ঠ তৈরি করে বছরের পর বছর মধু সংরক্ষণ করতে হয়। মজার ব্যাপার হলো, তারা প্রয়োজনের চেয়ে এত বেশি মধু তৈরি করে যে, মানুষ তাদের চাক থেকে মধু কেটে নেওয়ার পরও তাদের টিকে থাকার মতো পর্যাপ্ত মধু চাকে অবশিষ্ট থাকে। প্রকৃতির এই নিখুঁত ব্যালেন্স বা ভারসাম্য সৃষ্টিকর্তার পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
একটি মৌমাছির চাকে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। সেখানে রানী মৌমাছি, পুরুষ মৌমাছি এবং কর্মী মৌমাছিদের কাজ সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট।
কর্মী মৌমাছিরা নিরলসভাবে কাজ করতে করতে এক সময় উড়ন্ত অবস্থাতেই ডানা ভেঙে বা ক্লান্ত হয়ে মারা যায়। তারা তাদের নিজেদের সুখ বা ভোগের কথা চিন্তা করে না, বরং পুরো চাক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করে।
এই যে নিখুঁত নিয়মানুবর্তিতা, একে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় "ইউসোশ্যালিটি" (Eusociality) বা পরম সামাজিক আচরণ বলা হয়। এই ক্ষুদ্র পতঙ্গের মাথায় এত জটিল সামাজিক বুদ্ধি কে দিল? পবিত্র কুরআন এর উত্তর দেয়—তাদের পালনকর্তা তাদের মনে এই ওহী বা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তাদের এই ‘রোবোটিক’ নিয়মানুবর্তিতা ও আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, তারা কোনো অন্ধ বিবর্তনের ফসল নয়, বরং এক মহান সৃষ্টিকর্তার নিখুঁত পরিকল্পনার (Divine Engineering) অধীনে পরিচালিত।
মৌমাছির এই জীবন প্রণালী মানুষের অহংকার এবং স্বার্থপরতার গালে এক বিরাট চড়। আল্লাহ মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা করেছেন। অথচ একটি ক্ষুদ্র মৌমাছি নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো পৃথিবীর উদ্ভিদজগৎ (পরাগায়নের মাধ্যমে) এবং মানবজাতিকে (মধুর মাধ্যমে) বাঁচিয়ে রাখছে।
এর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে শিক্ষা দিচ্ছেন:
1.প্রকৃত সফল জীবন সেটিই, যা অন্যের কল্যাণে আসে। 2.আল্লাহর দেওয়া মেধা ও মেধাশক্তিকে অলস বসিয়ে না রেখে মৌমাছির মতো নিরলসভাবে কাজে লাগানো উচিত।
মৌমাছি নিজের অজান্তেই আল্লাহর এক মহান সেনাদল হিসেবে কাজ করছে। তারা মধু তৈরি করে, সংরক্ষণ করে এবং মানুষের জন্য তা ছেড়ে দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। এটি কোনো অন্ধ বিবর্তন বা কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না; এটি হলো সেই পরম কুশলী, সর্বজ্ঞাত আল্লাহর নিখুঁত প্রকৌশল (Divine Engineering), যা মানুষকে প্রতিনিয়ত আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত হতে আহ্বান জানায়।
মহাবিশ্বের এই বিশাল আয়োজন, মৌমাছির মধু কিংবা চতুষ্পদ জন্তুকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার মূল কারণ হলো—আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা হিসেবে এক অনন্য মর্যাদা ও সম্মান (তাকরীম) দান করেছেন। সূরা আল-ইসরা-এর ৭০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই আমি বনী আদমকে (মানবজাতিকে) সম্মানিত করেছি...”
মানুষকে সুন্দরতম অবয়ব, স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will) এবং খলিফা বা আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। এই মর্যাদার কারণেই দুনিয়াকে চন্দ্র, সূর্য, বাতাস ও ফলমূল দিয়ে একটি নিখুঁত স্বর্গীয় বাগান হিসেবে মানুষের জন্য সাজানো হয়েছে।
মানুষকে আল্লাহ যে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব ও মেধা দিয়েছেন, তার অন্যতম প্রধান কাজ হলো আল্লাহর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা। কুরআনের পরিভাষায় একে ‘তাফাক্কুর’ বলা হয়। সূরা আল-ইমরানের ১৯০-১৯১ নম্বর আয়াতে রাত-দিনের আবর্তন এবং আসমান-জমিনের সৃষ্টি নিয়ে বুদ্ধিমানদের চিন্তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মৌমাছির ক্ষুদ্র জীবন, শৃঙ্খলা এবং পরাগায়নের (Pollination) মাধ্যমে পৃথিবীর খাদ্য শৃঙ্খল সচল রাখার বৈজ্ঞানিক রহস্য নিয়ে মানুষ যখন গবেষণা করে, তখন তার ঈমান এক অকাট্য ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিসম্পন্ন দৃঢ় ঈমানে রূপান্তরিত হয়। মেধা ব্যবহার না করে যারা সত্যের সন্ধান করে না, কুরআন তাদের পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট ঘোষণা করেছে।
মৌমাছির স্বার্থহীন পরোপকারিতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের উচিত তার মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে মানব কল্যাণে নিয়োজিত করা। একজন মুমিনের এই সমাজসেবা ও কল্যাণের পেছনে দুটি প্রধান চালিকাশক্তি থাকে:
* আল্লাহর সন্তুষ্টি (রেজায়ে ইলাহী): কোনো নাম, যশ বা খ্যাতির আশা না করে একমাত্র সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য মানুষের সেবা করা। হাদিসে কুদসী অনুযায়ী, একজন অসুস্থ বা ক্ষুধার্ত মানুষের সেবা করার অর্থ স্বয়ং আল্লাহর সেবা করা।
* সদকায়ে জারিয়া (স্থায়ী পুণ্য): মানুষ মৃত্যুর পর তার আমলনামা বন্ধ হয়ে গেলেও সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব জারি থাকে। মেধা ও বিজ্ঞান ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ যখন কোনো নতুন আবিষ্কার (যেমন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বা কল্যাণকর প্রযুক্তি) রেখে যায়, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে সাহায্য করে, তখন মৃত্যুর পরও কবরে তার পুণ্য পৌঁছাতে থাকে।
উপসংহার
সূরা আন-নাহলের বার্ধক্য ও মৃত্যুর অমোঘ নিয়মের (আয়াত ৭০) দিকে তাকালে বোঝা যায় মানুষের এই পার্থিব জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। এই সংক্ষিপ্ত জীবনে আল্লাহ প্রদত্ত স্বাধীন ইচ্ছা ও মেধারূপী যে ‘মহা-আমানত’ আসমান-জমিন ভয় পেয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিল, মানুষ তা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। অতএব, একটি ক্ষুদ্র মৌমাছি যদি নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো পৃথিবীর উদ্ভিদজগৎ ও মানবজাতিকে মধুর মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, তবে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের দায়িত্ব আরও অনেক বেশি। মানুষের উচিত অহংকার ও স্বার্থপরতা ত্যাগ করে, মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করা এবং নিরেট আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানব কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করা।
