বাঞ্ছারামপুর ( ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
শারদীয় দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বছর শেষে সবচেয়ে বড় উৎসব।সপ্তাহব্যাপী চলে তাদের এই উৎসবের আয়োজন।সেই আয়োজনে অন্যতম অংশ বাদ্যযন্ত্রের দল। পূজার মৌসুমে এই বাদ্যকররা তাঁদের নিস্তব্ধ গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরাঞ্চলে ছুটে আসেন, যেখানে পূজামণ্ডপের সবচেয়ে বড় সমাগম ঘটে।অন্যান্য বছরের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরেও তার ব্যতয় ঘটেনি।
ঢাক-ঢোল নিয়ে তারা এখন পূজোর মন্ডবে মন্ডবে। সারা দিন ধরে তাঁরা কেউ ঢাক-ঢোল,বাঁশি,কাসা, ঝুনঝুনি (ঝুমুর) বাজান। ছন্দ একই থাকে, কিন্তু লয় বদলাতে থাকে প্রতি কয়েক মিনিটে—কখনো ধীর, কখনো দ্রুত, আবার ধীর।
তিন আঙুলে (বুড়ো আঙুল, তর্জনী ও মধ্যমা) দুটি কাঠি ধরে তাঁদের হাত চলে প্রজাপতির ডানার মতো। "পূজার বাদ্য" নামে পরিচিত এই বিশেষ ছন্দ শত শত বছর ধরে অপরিবর্তিত রূপে বাজানো হচ্ছে, আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তাঁরা ঢাক বাজানোর এই শিল্প রক্তে বহন করে চলেছেন। বাদ্যকরদের অন্যতম উপাদান ঢাক। "ঢাক"—গ্রামাঞ্চলের দুর্গাপূজায় ব্যবহৃত বিশিষ্ট বাদ্যযন্ত্র। যারা এটি বাজায় তাদের বলা হয় ঢাকি। পূজার মৌসুমে এই ঢাকিরা তাঁদের নিস্তব্ধ গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরাঞ্চলে ভিড় জমান, যেখানে পূজামণ্ডপের সবচেয়ে বেশি সমাগম।
তারা পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা,নারায়নগঞ্জ,নরসিংদী জেলা থেকে ভাড়ায় এসেছেন। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় এ বছর ৪৬টির বেশি মণ্ডপ নির্মিত হয়েছে, যেখানে বাজানোর জন্য ৭০-৮০জনের বেশি ঢাকি প্রয়োজন। তাদের সহায়তায় মণ্ডপ একটানা পাঁচ দিন উৎসবের ঢাকের তালে মুখর থাকে।
ঢাকি সমীর দাস বলেন, "ঢাকের এই ছন্দের মধ্যে বিশেষ কিছু আছে, যা প্রতিটি বাঙালির হৃদয় ছুঁয়ে যায়, সে যেখানেই থাকুক না কেন। এটা রক্তের স্রোতের ভেতরে ঢেউ তোলে। সন্ধ্যায় তিনি উপজেলার উজানচর মণ্ডপে ঢাক বাজাচ্ছিলেন। ধূপের ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে একদল ভক্ত তখন দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিবার—গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও মহিষাসুর-এর বেদির সামনে নৃত্য করছিলেন। সন্ধ্যার এই নৃত্যের নাম আরতি।
আরেক বাদ্যকর স্বপন দাস জানান, পূজার এই ছন্দ বাজানো হয় ৬/৮ মাত্রার চক্রে, যা ঝুমুর তালের মতো। তিনি আরো বলেন "এটা হৃদয় ছুঁয়ে যায়, কারণ ঝুমুর তাল হলো সারা বিশ্বের সব ধরনের লোকসংগীতের অন্তর্নিহিত মৌলিক ছন্দ। এটি এমন এক ছন্দ-কাঠামো, যার সঙ্গে সারা বিশ্ব আত্মিকভাবে যোগাযোগ করতে পারে।"
সোমবার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাঞ্ছারামপুরের জমিদার বাড়ির পূজামণ্ডপে চার ঢাকির একটি দল বাজাচ্ছিল। দলটি এসেছে নরসিংদির মনোহরদী উপজেলার একটি গ্রাম থেকে।এই ছোট বাদ্যদলটি বাজাচ্ছিল দুটি ঢাক, একটি ঢোল ও একটি কাঁসর ঘণ্টা (ধাতব বাদ্যযন্ত্র) নিয়ে।
তাদের নেতা আশিষ কুমার বলেন"ঢাক আর ঢোলের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। "ঢাক আকারে বড় এবং শুধু এক পাশে বাজানো হয়। ঢোল বাজানো হয় দুই পাশে। ঢাকের বোলই প্রধান ভূমিকা পালন করে; ঢোল ও কাঁসরের বোল কেবল ঢাকের সঙ্গে সঙ্গত করে।"
"দেবী দুর্গা ও কালীর পূজার সঙ্গে এটি চমৎকারভাবে মানিয়ে যায়; দুজনই শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীক।"ঝুনঝুনি ( ঝুমুর) বাজাচ্ছিলো কিশোর কমল দাস। সে জানায়,আমি এটি সিজনাল করি।পুজো শেষে সেলুনে নাপিতের কাজে ফিরে যাবো।উজানচরের ঢাকির দলটিকে ভাড়া করা হয়েছে ৬৫,০০০ টাকায়।
"এই চুক্তিতে দুর্গাপূজা ও কালীপূজা দুটোতেই বাজানো অন্তর্ভুক্ত। কালীপূজা দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হবে," বলেন বাঞ্ছারামপুর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রতন কুমার সাহা। তিনি আরও বলেন, "আমরা প্রতি বছর একই দলকে ভাড়া করি না। তাদের বাজনার মান দেখে নিয়োগ দিই।"
উপজেলার সাহা পাড়ার মন্দিরের মণ্ডপে ঢাকির আরেকটি দল শুধু দুর্গাপূজায় বাজানোর জন্য ৪৫,০০০ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।বাদ্যকর রমেশ বিশ্বাস বলেন"পূজাই আমাদের ব্যস্ততম মৌসুম, যা আমাদের বছরের ৯ মাস ব্যস্ত রাখে। বিয়ে, জন্মদিন, খৎনা, এমনকি রাজনৈতিক সমাবেশের মতো নানা অনুষ্ঠানে আমাদের ভাড়া করা হয়।তারা এলাকায় "ব্যান্ড পার্টি" নামে পরিচিত।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে , ঢাক ঢোল বা ঝুনঝুনির স্থান দখল করে নিচ্ছে আধুনিক সাউন্ডবক্স।এতে বিভিন্ন ভাষার উচ্চ সুরে গান বাজতে থাকে।আর তার তালে তালে যুবক তরুনরা নাচতে দেখা গেছে।পূজো আয়োজক কমিটির সদস্য নিতাই চন্দ্র বলেন, কি যুগ যে এলো ছেলেরা এখন ঢাক ঢোলের পরিবর্তে সাউন্ডবক্সের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।কিন্তু, আমরা প্রবীণরা ঢাক ঢোলের ছন্দই বেশী পছন্দ করি।
