আজকাল ওয়েবডেস্ক: উৎসবের আবহে হঠাৎই বেজে উঠল সাইরেন, আর মুহূর্তের মধ্যে দুর্গাপুজোর আনন্দ রূপ নিল চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনে। দিল্লির ‘মিনি কলকাতা’ বলে পরিচিত চিত্তরঞ্জন পার্ক বা সিআর পার্কের দুর্গাপুজোয় দিল্লি পুলিশ ও সিআরপিএফের বিশাল বাহিনীর উপস্থিতি এবং সাধারণ দর্শনার্থী ও পুজো উদ্যোক্তাদের হেনস্থার অভিযোগে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজধানী জুড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, শনিবার গভীর রাতে পুজোর আলোয় সাজানো মণ্ডপ চত্বরে আচমকাই লাঠি হাতে সারিবদ্ধভাবে ঢুকছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান ও পুলিশের দল। অভিযোগ, পুজোর আনন্দঘন পরিবেশে পরিবার-পরিজন নিয়ে উপস্থিত সাধারণ মানুষকে জোর করে মণ্ডপ থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয় এবং মাইকের শব্দ বন্ধ করার নামে লাইট ও সাউন্ডের বৈদ্যুতিক সংযোগও কেটে দেওয়া হয়।
ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা। সিআর পার্কের বি ব্লকের মণ্ডপের বাইরের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে তিনি স্থানীয় অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ধরের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন, শনিবার রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ প্রায় কুড়ি জন সশস্ত্র সিআরপিএফ জওয়ান পুজো প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ে। তবে পুজো কমিটির সদস্যরা এই অপ্রত্যাশিত অনুপ্রবেশের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁদের মণ্ডপ চত্বর থেকে বের করে দেন। আরও বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগ, শুধু মণ্ডপেই নয়, রাত এগারোটার পর গোটা সিআর পার্ক চত্বরে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী সাইরেন বাজিয়ে টহল দেয় এবং রাত এগারোটা পর্যন্তই সময়সীমা ধার্য থাকার যুক্তি দেখিয়ে পুরো এলাকা খালি করে দেয়। পুজোর ভরা রাতে এমন দৃশ্য দিল্লির বুকে অত্যন্ত অভাবনীয় ও ভীতিকর বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উৎসবপ্রেমীরা।
বিষয়টি সামনে আসতেই খোদ রাজধানীতে শুরু হয়ে যায় তীব্র রাজনৈতিক তরজা। দিল্লির বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও পুলিশের বিরুদ্ধে বাঙালি সম্প্রদায়কে পরিকল্পিতভাবে হেনস্থার অভিযোগ তুলে ময়দানে নামে আম আদমি পার্টি। আপের দিল্লি সভাপতি তথা ওই এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক সৌরভ ভরদ্বাজ উপ-রাজ্যপালকে ট্যাগ করে ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন, দিল্লির অন্যতম ভদ্র ও শিক্ষিত অংশ হিসেবে পরিচিত এই বাঙালি সমাজকে এমন আচরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কেন। তাঁর প্রশ্ন, যেখানে শহরে চব্বিশ ঘণ্টা দোকানপাট খোলা রাখা নিয়ে কথা বলা হয় এবং রামলীলা মধ্যরাত পেরিয়ে চলার অনুমতি পায়, সেখানে বাঙালির দুর্গাপুজো এগারোটাতেই বন্ধ করে দিয়ে এই বিমাতৃসুলভ আচরণ কেন করা হচ্ছে। এমনকি পুলিশের এমন জবরদস্তির কারণে পদপিষ্ট হওয়ার মতো ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারত বলেও সতর্ক করেন তিনি।
যদিও যাবতীয় অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে দিল্লি পুলিশ। ডিসিপি সাউথ দিল্লির পক্ষ থেকে এক বিবৃতি জারি করে জানানো হয়, পুজো পণ্ড করার কোনও অভিপ্রায় পুলিশের ছিল না; আদালতের শব্দদূষণ সংক্রান্ত নির্দেশিকা কঠোরভাবে বজায় রাখতেই তারা হস্তক্ষেপ করেছিল। পুলিশের দাবি, আগের বৈঠকগুলোতে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়েও উচ্চস্বরে সাউন্ড সিস্টেম বাজাচ্ছিলেন, যার জেরেই আইন শৃঙ্খলা ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে নিয়ম কার্যকর করতে হয়েছিল। উৎসবের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে তারা পুজো কমিটিগুলোর সহযোগিতা কামনা করলেও, পুজোর মেজাজে খোদ রাজধানীতে এমন পুলিশি হস্তক্ষেপের ক্ষত এখনও গভীর অস্বস্তি তৈরি করে রেখেছে সিআর পার্কের বাসিন্দাদের মনে।
