২০২৯ সাল থেকে নতুন স্থানে সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য সরকারের। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা প্রাথমিক ব্যয়ের এ পরিকল্পনায় রয়েছে ১২ তলা ১৪টি ভবন, চক্রাকার ও পাতাল সড়ক। পুরোনো সচিবালয়ে জায়গার সংকট, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব, স্থানান্তরের পক্ষে সরকারের যুক্তি এগুলোই।
তবে ব্যয় সাশ্রয়, অপচয় রোধ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতির মধ্যে কয়েক হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। কোথায় হচ্ছে নতুন সচিবালয়, আর স্থানান্তরই কি সংকট সমাধানের একমাত্র পথ?
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘১৯৭০ সালের আগে, যখন এটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সচিবালয় ছিল না, তখনকার পরিসরে স্বাধীন রাষ্ট্রের এতগুলো মন্ত্রণালয় গাদাগাদি করে রাখার জন্য অনেক উঁচু ভবন তৈরি ও সাজানো হচ্ছে। এটি সঠিক কি না, সে বিষয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
এদিকে আরেক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ জানান, ‘আপনারা আশপাশে তাকালে মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া এবং মিরপুরের মতো জনবহুল এলাকা দেখতে পাবেন। এখানকার জায়গাটিও বেশ ছোট। এ ছাড়া আশপাশে যানবাহন চলাচলের জন্য যে ব্যবস্থা ও অবকাঠামো রয়েছে, তা এই এলাকার বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সচিবালয় স্থানান্তর নয়, ঢাকার ওপর চাপ কমানো এবং সরকারি কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা।
আকতার মাহমুদ আরও জানান, ‘এটি ঢাকা শহরের বাইরে কোথাও হতে পারে। এমনকি পূর্বাচলেও হতে পারে, অথবা পূর্বাচলের আশপাশের অন্য কোনো জায়গায়ও হতে পারে। তবে সেখানে অবশ্যই ভালো পরিবহন যোগাযোগব্যবস্থা থাকতে হবে। এই যোগাযোগব্যবস্থা মেট্রোরেল কিংবা বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) হতে পারে।’
যানজটের সমস্যার প্রসঙ্গে ইকবাল হাবিব বলেন, ‘যারা মনে করেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা আন্ডারগ্রাউন্ড অবকাঠামোর মাধ্যমে এর জটিলতা বা প্রভাব মূল্যায়ন না করেই যানজটের সমস্যা নির্ধারণ করা যাবে, তাদের উচিত ইতিমধ্যে নির্মিত বিশাল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামোর প্রভাব বিশ্লেষণ করা।’
সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি উঠেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠের ভবিষ্যৎ ঘিরেও। গত ১৫ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
অন্যদিকে, শেকৃবির গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধার স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এম. সালাহউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন রয়েছে, যার বিষয়ে সম্ভবত আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়নি। এখানকার পরিবেশগত বিষয়টিও তাঁর কাছে তুলে ধরা হয়নি। এই ক্ষেত্রে প্রধান অংশীজন হলো শিক্ষার্থীরা। এখানে তাদের গবেষণার বিষয় রয়েছে, পাশাপাশি মাঠটি ব্যবহারের বিষয়ও রয়েছে। একটি সুন্দর পরিবেশে পড়াশোনা করার অধিকার তাদের আছে। সুতরাং, শিক্ষার্থীরা যদি এ নিয়ে কোনো আন্দোলনে নামে, তাহলে আমরা অবশ্যই আশা করব, সরকার বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।’
রাজধানীতে খোলা জায়গা, খেলার মাঠ ও মানুষের চলাচলের পরিসর এমনিতেই সীমিত। এর মধ্যে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনায় পরিবেশ ও নগরজীবনের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তাই প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার দাবি পরিবেশবাদীদের।
