জগন্নাথ থেকে পেশোয়ার: উপমহাদেশে শিক্ষাঙ্গনে মৃত্যুর মিছিল
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ: আপডেট:
বিদ্যালয় হওয়ার কথা শিশুদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়গুলোর একটি। যেখানে সকাল শুরু হয় বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দে, বন্ধুদের হাসিতে আর শিক্ষকের স্নেহমাখা নির্দেশনায়। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বারবার সেই বিদ্যালয়ই পরিণত হয়েছে মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনায়। কখনো দুর্বল ভবনের ছাদ ভেঙে, কখনো আগুনে, কখনো সন্ত্রাসী হামলায়।
যে শিশুরা সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল নতুন কিছু শেখার স্বপ্ন নিয়ে, তাদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পাকিস্তানের পেশোয়ারের একটি বিদ্যালয়ে ছাদধসের ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে উপমহাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো ও অস্বস্তিকর প্রশ্নটি: শিশুদের জন্য আমরা আসলে কতটা নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন গড়ে তুলতে পেরেছি?
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারের দির কলোনিতে বেসরকারি আল-খায়ের এডুকেশন সেন্টারে বৃহস্পতিবার সকালে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। পাঠদান চলার সময় তিনতলা ভবনের ওপরের অংশের ছাদ ধসে নিচের তলাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুহূর্তেই বিদ্যালয়জুড়ে নেমে আসে বিপর্যয়। উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে অংশ নেন। আহতদের নেওয়া হয় পেশোয়ারের লেডি রিডিং হাসপাতালে।
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৮ জন শিশু এবং একজন নারী শিক্ষক। আহত হয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক মানুষ। উদ্ধারকাজ ও তদন্ত চলতে থাকায় হতাহতের সংখ্যা পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ভবনটির দুর্বল কাঠামোকে।
এই দুর্ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক শোকের দিনের অদ্ভুত মিল। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাদধসের ট্র্যাজেডির ৪১তম বার্ষিকীর দিনেই পাকিস্তানে ঘটল এ ঘটনা। চার দশকের বেশি সময়ের ব্যবধান, দুটি আলাদা রাষ্ট্র, ভিন্ন বাস্তবতা। কিন্তু দুর্ঘটনার প্রকৃতিতে যেন একই বেদনাদায়ক প্রতিধ্বনি। সেদিন জগন্নাথ হলের টেলিভিশন কক্ষে শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও অতিথিরা জড়ো হয়েছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’ দেখতে। রাতের সেই আনন্দময় পরিবেশ মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকে, যখন ভবনের ছাদ ভেঙে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় ২৬ শিক্ষার্থীসহ ৪০ জন প্রাণ হারান। বহু মানুষ আহত হন। সেই স্মৃতিকে ধারণ করে ১৫ অক্টোবর আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে।

জগন্নাথ হলের সেই ঘটনা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে অবকাঠামোগত নিরাপত্তার অন্যতম বড় সতর্কবার্তা ছিল। ভবনের বয়স, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা, অতিরিক্ত মানুষের সমাগম এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা ব্যবহারের প্রশ্নগুলো সেদিন সামনে এসেছিল। দীর্ঘ ৪১ বছর পর পেশোয়ারে স্কুলের ছাদধস সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোই নতুন করে উত্থাপন করেছে। দুটি ঘটনার সময় ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও একটি মৌলিক বাস্তবতা অভিন্ন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নিরাপদ না হলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে।
পেশোয়ার শহরটির সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনের শোকের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর এই শহরের আর্মি পাবলিক স্কুলে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয় ১৩২ শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৪১ জন। পাকিস্তানের ইতিহাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে চালানো সবচেয়ে মর্মান্তিক হামলাগুলোর একটি ছিল সেটি। সেদিন পুরো বিশ্ব দেখেছিল, একটি বিদ্যালয়ের ওপর আঘাত কীভাবে গোটা জাতিকে স্তব্ধ করে দিতে পারে।

বারো বছর পর একই শহরে আবার শিশুদের মৃত্যু ঘটল। এবার সন্ত্রাসী হামলা নয়, বিদ্যালয়ের ছাদধস। দুটি ঘটনার কারণ একেবারেই আলাদা, কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার বেদনা একই।

ভারতের ইতিহাসেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাণহানির একাধিক ঘটনা গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ২০০৪ সালের ১৬ জুলাই তামিলনাড়ুর কুম্বাকোনম শহরের একটি বিদ্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারায় ৯৪ শিশু। স্কুল ভবনের দাহ্য ছাউনি, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দ্রুত বেরিয়ে আসার সুযোগের অভাব সেই বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। দুর্ঘটনাটি ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু ঘটনার পর নানা প্রতিশ্রুতি ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দক্ষিণ এশিয়ার বহু বিদ্যালয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি আজও উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে।

সেই ভারতের রাজস্থানেই ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই পিপলোদি সরকারি বিদ্যালয়ের ভবনের ছাদ ধসে সাত শিশুর মৃত্যু হয়। প্রমাণ হয় যে প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে যেখানে নিয়মিত ভবন পরিদর্শন, সংস্কার এবং দুর্যোগকালীন নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, সেখানে শিক্ষা গ্রহণের স্বাভাবিক পরিবেশ অনিশ্চিত।

বাংলাদেশও সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাঙ্গনে ভয়াবহ প্রাণহানির সাক্ষী হয়েছে। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে বহু শিক্ষার্থীসহ প্রাণ হারান অনেক মানুষ। দুর্ঘটনার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান ও নিরাপত্তা, জনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। শ্রেণিকক্ষের পরিচিত পরিবেশ যে বাইরের কোনো দুর্ঘটনার কারণেও মুহূর্তে বিপর্যস্ত হতে পারে, মাইলস্টোনের ঘটনা ছিল তার নির্মম উদাহরণ।

পাকিস্তানের পেশোয়ারে স্কুল ট্র্যাজেডির মাত্র দুই দিন আগে ১৩ অক্টোবর, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জলসিঁড়ি ক্যাম্পাসে ঘটে আরেক হৃদয়বিদারক ঘটনা। স্কুল ছুটির পর নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাসের চাপায় প্রাণ হারায় দ্বিতীয় শ্রেণির আট বছর বয়সী শিক্ষার্থী শাহরিয়ার শায়ন। যে বিদ্যালয়ে শিশুটি প্রতিদিন পড়তে যেত, সেই বিদ্যালয়ের আঙিনাতেই নিভে যায় তার জীবনপ্রদীপ। দুর্ঘটনাটি স্কুল ক্যাম্পাসে যানবাহন চলাচল, শিশুদের ওঠানামার ব্যবস্থাপনা এবং কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা যে শুধু শ্রেণিকক্ষ কিংবা ভবনের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্কুলের প্রবেশপথ, খেলার মাঠ ও পরিবহনব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন, শায়নের মৃত্যু সেই বাস্তবতাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশে স্কুলবাসের নিচে শিশুর মৃত্যু এবং পাকিস্তানে বিদ্যালয়ের ছাদধস উপমহাদেশের শিক্ষাঙ্গনে শিশুদের নিরাপত্তাহীনতার ভিন্ন দুই চিত্র সামনে এনেছে।
পেশোয়ার, কুম্বাকোনম, রাজস্থান কিংবা ঢাকা; এসব ঘটনার পেছনে কারণ এক নয়। কোনোটি ভবনধস, কোনোটি অগ্নিকাণ্ড, কোনোটি বিমান দুর্ঘটনা, আবার কোনোটি পরিকল্পিত সহিংসতা। সব ঘটনাকে একই ধরনের অবহেলার ফল বলাও সঠিক হবে না। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মধ্যে মিল রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার কেন্দ্রেই ছিল শিক্ষার্থী, আর প্রতিটি বিপর্যয়ের পর নতুন করে উচ্চারিত হয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি। প্রশ্ন উঠেছে, বিপর্যয়ের আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব ছিল কি না, সতর্কবার্তাগুলো যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছিল কি না এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই শিক্ষা সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, পুরোনো ভবনে নতুন তলা যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি ভবনের নির্মাণমান, ধারণক্ষমতা ও স্থায়িত্ব যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনুমোদন, তদারকি এবং ভবন ব্যবহারের শর্ত কতটা কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের আজকের দুর্ঘটনায় ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতার যে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে, তা এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে।

এ অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে পুরোনো ভবনের ঝুঁকি নতুন মাত্রা পায়। দীর্ঘদিনের পানির ক্ষতি, অপরিকল্পিত সংস্কার, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ভবনের স্থায়িত্ব কমিয়ে দিতে পারে। অনেক সময় ভবনে দৃশ্যমান ফাটল কিংবা ক্ষয়ের লক্ষণ থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করা হয় না। আবার কোথাও পর্যাপ্ত বিকল্প ভবন না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাতেই পাঠদান চালিয়ে যেতে হয়। এসব পরিস্থিতিতে নিয়মিত কাঠামোগত পরীক্ষা, প্রকৌশলীদের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং বিপজ্জনক ভবন দ্রুত ব্যবহার বন্ধ করার ব্যবস্থা জরুরি হয়ে ওঠে।
তবে শুধু ভবনের নিরাপত্তাই যথেষ্ট নয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জরুরি বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, উদ্ধার মহড়া, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং স্থানীয় জরুরি সেবার সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগও নিশ্চিত করতে হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আতঙ্ক সৃষ্টি না করে বিপদের সময় কীভাবে নিরাপদে সরে যেতে হবে, সেই প্রস্তুতিও থাকা প্রয়োজন। নিরাপত্তার বিষয়টিকে আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এসব ট্র্যাজেডির আরেকটি বড় দিক হলো দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানসিক প্রভাব। দুর্ঘটনার সংবাদে প্রথম কয়েক দিন শোক, ক্ষোভ ও সমবেদনার প্রকাশ ঘটে। উদ্ধার অভিযান শেষ হয়, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা আসে। কিন্তু যারা প্রিয়জন হারান, তাদের জীবনে সেই শূন্যতা দীর্ঘদিন থেকে যায়। আহত শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শীদেরও অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তার প্রয়োজন হয়। ফলে ক্ষতিপূরণ কিংবা সাময়িক আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি পুনর্বাসন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও জরুরি।
উপমহাদেশের শিক্ষাঙ্গনে ঘটে যাওয়া এসব বিপর্যয় রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আনে। দুর্ঘটনার পরে তদন্তের ঘোষণা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা। কোনো ভবন ব্যবহারের অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, নিরাপত্তা পরীক্ষা হয়েছিল কি না, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো তাদের কাজ করেছে কি না; এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। একটি দুর্ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা যদি অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বাড়াতে কাজে না লাগে, তাহলে একই ধরনের বিপর্যয় পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যায়।
আজকের পেশোয়ার ট্র্যাজেডির সঙ্গে জগন্নাথ হলের শোকাবহ বার্ষিকীর কাকতালীয় মিল শুধু ইতিহাসের দুটি তারিখকে একসূত্রে বাঁধেনি, শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তাকেও নতুনভাবে সামনে এনেছে। একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১ বছর আগের নিহতদের স্মরণ, অন্যদিকে পাকিস্তানের একটি বিদ্যালয়ে নতুন করে স্বজন হারানোর শোক। দুটি ঘটনা যেন চার দশকের ব্যবধান অতিক্রম করে একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে উপমহাদেশকে: শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তাকে আমরা কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছি?

একটি বিদ্যালয় শুধু পাঠদানের স্থান নয়। এটি একটি সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন অসংখ্য পরিবার তাদের সন্তানদের সেখানে পাঠায় এই বিশ্বাসে যে, তারা নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করবে। সেই বিশ্বাস অটুট রাখার দায়িত্ব বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং রাষ্ট্রের। নিরাপত্তার ঘাটতিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।
পেশোয়ারের আজকের দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা কোনো একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। উপমহাদেশজুড়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জননিরাপত্তা ও নীতিগত প্রশ্ন। যে অঞ্চলে শিক্ষাকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত।
১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকার জগন্নাথ হলে যে শোক নেমে এসেছিল, তার স্মৃতি আজও অমলিন। ২০২৬ সালের একই দিনে পেশোয়ারের একটি বিদ্যালয় যুক্ত হলো উপমহাদেশের শিক্ষাঙ্গনের বেদনাবহ ইতিহাসে। মাঝের ৪১ বছরে সমাজ, প্রযুক্তি ও শিক্ষাব্যবস্থায় বহু পরিবর্তন এসেছে। তবু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজতে হচ্ছে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা সম্ভবত একটাই: ট্র্যাজেডি স্মরণ করার পাশাপাশি তা থেকে শিক্ষা নেওয়াও জরুরি। কারণ বিদ্যালয়ের প্রতিটি দরজা খুলে যাওয়ার অর্থ হওয়া উচিত নতুন সম্ভাবনার সূচনা, কোনো পরিবারের জন্য অনিশ্চয়তার শুরু নয়। শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তবেই শোকের এই পুনরাবৃত্তি রোধের পথে এগোনো সম্ভব।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
