শরতের শুভ্রতা আর নদীর ধারে কাশফুলের দোলায় প্রকৃতির মাঝে যখন শিহরণ জাগে, ঠিক তখনই ঢাকের আওয়াজ জানান দেয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌর এলাকার পুরাতন বাজারে প্রায় আড়াইশ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে এবারও বসেছে দেশের অন্যতম প্রাচীন ঢাকঢোল ও বাঁশির মেলা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী এই মেলা চলবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত।
ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিয়ম অনুযায়ী, দুর্গাপূজা উপলক্ষে দূরদূরান্ত থেকে আসা পেশাদার বাদক দল বা ঢাকিদের পছন্দ করে বায়না বা চুক্তি করতে আসেন বিভিন্ন এলাকার পূজারিরা।
মেলায় আসা ঢাকিরা দলবেঁধে ঢাকঢোল ও বাঁশি বাজিয়ে এবং নানা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ফুটিয়ে তুলে পূজারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। বাদ্যের ছন্দ পছন্দ হলে শুরু হয় বায়না নিয়ে দরকষাকষি। দলের সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ভিন্নতা এবং পরিবেশনার ধরন বিবেচনা করে নির্ধারিত হয় চুক্তির পরিমাণ। ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাশাপাশি গাজীপুর, হবিগঞ্জ ও হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন পূজা কমিটির লোকজন এই মেলায় এসে পছন্দের বাদক দল বায়না করে নিয়ে যান।
স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় উপজেলার চারিপাড়া গ্রামের রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। পূজার জন্য সেরা ঢাকিদের খুঁজতে বিক্রমপুর পরগনাসহ (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) বিভিন্ন এলাকায় বার্তা পাঠানো হলে নৌপথে অসংখ্য ঢাকি কটিয়াদীতে সমবেত হন। কালক্রমে সেই সমাগমই আজকের এই ঐতিহাসিক ঢাকের হাটে রূপ নেয়। একসময় আড়িয়াল খাঁ নদ দিয়ে নৌকায় করে ঢাকার নবাবগঞ্জ, বিক্রমপুর, মুন্সীগঞ্জ, দোহার ও কেরানীগঞ্জ থেকে বহু ঢাকি আসলেও বর্তমানে অনেকেই সড়কপথে আসেন।
তবে সময়ের পরিবর্তন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সাউন্ড সিস্টেমের জনপ্রিয়তা বাড়ায় কালের প্রবাহে এই মেলার জৌলুস কিছুটা ম্লান হয়েছে। আগে যেখানে পাঁচশ থেকে এক হাজার ঢাকি অংশ নিতেন, এখন তা কমে আনুমানিক ৫০ থেকে ১০০ দলে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে মুঠোফোনেও বায়না চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় আগে থেকে চুক্তিবদ্ধ হতে না পারা ঢাকিরাই মূলত শেষ মুহূর্তে মেলায় হাজির হন।
মেলায় আসা বিক্রমপুরের ঢাকি সুশীল জানান, তাঁর আট সদস্যের দলে তিনটি বাঁশি রয়েছে এবং তিনি ৩০ হাজার টাকা বায়না চাচ্ছেন। মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা কৃষ্ণ গোপাল জানান, তাঁর ১৫ সদস্যের দলের জন্য ৬০ হাজার টাকা দাবি করলেও ক্রেতারা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বলছেন। সাউন্ড বক্সের দাপটে ঢাকঢোলের ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে গাজীপুর থেকে আসা পূজারি বিজয় সাহা বলেন, “ঢাকঢোল ও বাঁশি ছাড়া দুর্গাপূজার আনন্দ কখনোই পূর্ণতা পায় না। প্রতিবছরই এই মেলায় আসি এবং ঘুরে ঘুরে পছন্দমতো দল বেছে নিই।”
ঢাকের মেলা কমিটির সদস্য শম্ভু রায় বলেন, “আমরা ঢাকিদের তালিকা তৈরি করি এবং তাঁদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করি। কোনো দল বায়না না পেয়ে ফিরে গেলে তাঁদের যাতায়াত খরচ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।”
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ জানান, শতবর্ষী এই মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশের টহল দল সক্রিয় রয়েছে।
জেএইচআর
